শিরোনাম

হাওরের কান্না শুনতে কি পাও?

সর্বশেষ আপডেটঃ ০৪:২৯:৫১ পূর্বাহ্ণ - ১০ মে ২০১৭ | ২৭২

হাওরের মানুষের কান্না দেখে পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের ত্রাণ-সহায়তার গল্প নিয়ে এই বিশেষ আয়োজন

আমার কেহ নাই

শুরুটা হয়েছিল ২৬ এপ্রিল। টানা চার দিন পথে পথে ঘুরে তাঁরা গান গেয়েছেন। ‘ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই’ গানটি শুনে পথচলতি সাধারণ মানুষও গেয়ে উঠেছে। ‘বন্ধু বিনে প্রাণ বাঁচে না’—গানটি শুনে কলেজ-ফেরত এক ছাত্রীর মন এতটাই কাতর হয়ে গেল যে তিনি পার্স খুলে যা পেলেন সবটাই দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরলেন। এভাবে মানুষের কাছ থেকে হাওরবাসীর জন্য টাকা তুলেছেন তাঁরা। সিলেটের স্থিরচিত্র ও চলচ্চিত্র সংগঠন কাকতাড়ুয়ার ডাকে মাঠে নেমেছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংহতি জানিয়ে গেয়েছেন ছাত্র-ছাত্রীরা, মওলানা ভাসানীতে ফিল্ম সোসাইটি গেয়েছে। গায়ক পিন্টু ঘোষ ও নির্মাতা শাকুর মজিদও একাত্ম হয়েছেন। টিউশনি, ক্লাস ম্যানেজ করে, পরিবারের কারো অসুস্থতার দিকে না তাকিয়ে বৃষ্টি আর রোদে কাতর হয়ে তাঁরা টাকা তুলেছেন। সবার কণ্ঠেই ছিল—‘একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?’ বিদ্যুৎ নেই পুরো শহরে, তাও তাঁরা মোমের আলোতে টাকাগুলো প্যাকেটে ভরেছেন। ১ মে ভোরে দুর্যোগের ভেতরেই চলেছেন সুনামগঞ্জের শাল্লার দিকে। তখনো নাশতা খাওয়া হয়নি। দেখেছেন, বানের জলে ভেসে গেছে বাড়িঘর, ডুবেছে ফসল। একের পর এক হাওর পেরিয়ে পৌঁছেছেন দিরাই বাজারে। স্থানীয় গীতিকার-বাউল নজরুল ইসলাম তাঁদের নিয়ে গেছেন সুখলাইন গ্রামে। সেখানে কারো ঘরেই এক ছটাক চাল নেই, একবেলা করে প্রতিবেশীদের খাওয়াচ্ছে কেউ। এক হিন্দু গৃহকর্তা মারা গেছেন, তাঁর শ্রাদ্ধের পয়সাও নেই। ধনী-মধ্যবিত্ত, গরিব কৃষক কারোরই ফসল নেই। লজ্জায় মুখ ঢেকে তাঁরা ত্রাণ নিয়েছেন। পানিতে প্লাবিত গ্রামে বসার জায়গাও নেই। তার পরও তাঁরা ডাবের পানি, কড়া লিকারের চা দিয়ে অতিথি সেবা করলেন। ১০টি দুর্গত পরিবারকে কাকতাড়ুয়া পুরো মাসের খরচ দিয়ে ফিরেছে।

 

লেখা : রুহেল বিন সাইদ ও ফাল্গুনী দেব

ছবি : মিজানুর রহমান

আলোর পথে যাত্রা

‘ওই পিংকি, জলদি আয়’—৭০ বছরের বৃদ্ধা নাতনিকে ডেকে ত্রাণের জন্য তড়িঘড়ি চললেন। তখন আমি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার জয়শ্রী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে কিউরিসের (কিউরেটিভ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেটিভ ইনিশিয়েটিভ ফর সোসাইটি) নৌকা থেকে ত্রাণ নামানো তদারক করছি। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টিতে এ অঞ্চলের কৃষক-সাধারণ মানুষ সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। তাদের কান্নায় চারদিক থমথম করছে। তাদের সাহায্যের জন্য ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ‘আলোর পথে যাত্রা’ কর্মসূচির শুরু করেছিলাম। ২৪ থেকে ২৭ এপ্রিল বিকাশ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা দিয়েছে সবাই। সেগুলো দিয়ে ত্রাণ কেনার পাশাপাশি ত্রাণের জায়গাও আমরা নির্বাচন করেছি। এ জন্য ২৫ স্বেচ্ছাসেবী দিন-রাত খেটেছেন। সহযোগিতা করেছে আলোর তরী ফাউন্ডেশন, চিলড্রেনস হ্যাভেনের প্রতিষ্ঠাতা এস এম আল মাহমুদ এবং ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরা ক্যাম্পাসের প্রভাষক সাহাদাত রহমান পিয়াস ও তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা। ২৭ এপ্রিল রাতে ত্রাণ নিয়ে রওনা দিয়ে পরদিন স্কুল মাঠে এলাম। ১০০-রও বেশি পরিবারকে কিউরিসের প্রতিষ্ঠাতা ডা. তানভীর ইসলাম ত্রাণ দিলেন। এখানে আমরাই প্রথম ত্রাণ নিয়ে গেছি। তাদের চাল, গুড়, মুড়ি, চিঁড়া, বিস্কুট, মোমবাতি, দিয়াশলাই, ফিটকিরি, স্যালাইন, ওষুধ ইত্যাদির বাক্স দেওয়া হয়েছে। সেখানে অনেকের সব হারানোর বেদনাও দেখেছি। একজন কেঁদে বলেছেন, ‘বন্যায় সব গেছে বাপ, ধান গেছে। পাট বাঁচাইতে গরু বেচলাম, এহন খাওনের কিচ্ছু নাই। মাছও সব মরছে। এত বছরের জীবনে এমন মড়ক দেহি নাই। ’ কর্মসূচিতে কিউরিসের বুশরা, শুভ্র, রুশো, অপু, রিফাত, তানভীর, ফাহিম, ফারাবীসহ ১০ জনের দল অংশ নিয়েছে।

 

লেখা : সামান্তা সাবেদ

ছবি : এস এম আল মাহমুদ

ছবি এঁকে পাশে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে বেশ কয়েকজন জলরংয়ে ছবি আঁকছেন। কোনোটিতে প্রকৃতি, কোনোটিতে নারীর মুখ আঁকা। পেছনে বেশ কটি ছবি বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে। একজন শিল্পী বলেন, ‘হাওরে দুর্গতদের জন্য অর্থ সংগ্রহ ক্যাম্প করছি। ’ এই উদ্যোগের শুরুটি করেছিলেন চারুকলার সাবেক ছাত্র রতনেশ্বর সূত্রধর। তাঁর বাড়ি সুনামগঞ্জে। এখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের প্রভাষক। হাওরের দুর্গত স্বজনের জন্য তিনি কিছু করতে অনুষদের সমমনা শিল্পী-বন্ধুদের কাছে কথাটি পাড়তেই তাঁরা রাজি হয়ে গেলেন। ঠিক করা হলো, তাঁরা জলরংয়ের কর্মশালা করবেন। সেখানে নিজেরা ছবি আঁকবেন, অন্য শিক্ষক-বন্ধুদেরও ছবি আঁকার অনুরোধ করবেন। সেগুলো বিক্রি করে যে টাকা আসবে, তাই দিয়ে অসহায় মানুষকে সাহায্য করা হবে। সে জন্য ফেসবুকে একটি পোস্টও দেওয়া হলো—‘আমরা জলরংয়ের একটি কর্মশালা করছি। আপনারা এসে ছবি কিনবেন। আপনার একটি ছবির টাকা দিয়ে আমরা ৫০ থেকে ৫০০ বস্তা চাল দুর্গতদের দিতে পারব। ’ তাতে বেশ সাড়া পাওয়া গেল। অনুষদের মোহাম্মাদ ইউনূস স্যার ৫০০ বস্তা চাল পাঠিয়ে দিলেন। আবুল বারক আলভী, সমরজিৎ রায় চৌধুরীসহ বেশ কজন শিক্ষক ছবি দিয়েছেন। কর্মশালায় সাধারণ ছাত্ররা যেমন এঁকেছেন; সাবেক ছাত্র তরুণ ঘোষ, বিপাশা হায়াত, বিশ্বজিৎ গোস্বামীও এসে ছবি এঁকেছেন। রতনেশ্বর বললেন, ‘আমরা চাই মানুষ শিল্পের সঙ্গে বাঁচুক। এই কর্মশালা থেকে অনেক কম দামে ছবি কেনা যাবে। এ সুযোগ সহজে পাওয়া যায় না। ’ হাওরে যাওয়ার ব্যাপারে শিল্পী বললেন, ‘৬ মে কর্মশালা শেষ হলে কেনাকাটা সেরে দু-এক দিনের মধ্যে সুনামগঞ্জে যাব। আমরা নিজেরাই যাব, পাশে থেকে দুর্গতদের সাহায্য করব। ’

 

লেখা : মীর হুযাইফা আল-মামদুহ

ছবি : সিজান আহমেদ

সুত্র : – কালের কন্ঠ

 

janatarpratidin.com / Md. Bappy / Kukon/ Rokib/ 10 May 2017

 

এ বিভাগের জনপ্রিয় খবর

সর্বশেষ