শিরোনাম

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার ভিশন ২০৩০-তে যা থাকছে

সর্বশেষ আপডেটঃ ০৩:০৫:০৫ পূর্বাহ্ণ - ১০ মে ২০১৭ | ৩৬৮

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে কীভাবে দেশ পরিচালনা করা হবে তার জন্য ‘ভিশন ২০৩০’ সামনে রেখে রূপরেখা তুলে ধরবেন দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টায় দেশ ও জাতির উদ্দেশ্যে রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত হোটেল ওয়েস্টিনে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘ভিশন-২০৩০’ এর রূপরেখা তুলে ধরবেন তিনি।

এ বিষয়ে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান মো. শাহাজাহানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হোটেল ওয়েস্টিনে আগামীকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় ম্যাডাম খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে ম্যাডাম ‘ভিশন ২০৩০’ এর পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তুলে ধরবেন।

ভিশন ২০৩০-তে যা থাকছে

গত বছরের ১৯ মার্চ দলের ষষ্ঠ কাউন্সিলে ‘ভিশন ২০৩০’ নামের একটি কর্মপরিকল্পনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। যা আরও বিশদভাবে আলোচনা-পর্যালোচনার পর সোমবার (৮ মে) রাতে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রায় ৪ ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে ‘ভিশন ২০৩০’ পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের দেখানো হয়।

‘ভিশন ২০৩০’ এর সারসংক্ষেপে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘এর আলোকেই আগামীতে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি হবে। সৃজনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা হবে। আবার সরকার গঠনের সুযোগ পেলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে এবং দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট জাতীয় সংসদ করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে বিএনপি নতুন ধারার রাজনীতি ও সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। আর এ জন্য নতুন সামাজিক সমঝোতা বা চুক্তিতে উপনীত হতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

ওই সময় খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা সংকট নিরসন করে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ব্যাপকভিত্তিক একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা করছি। দেশের অগ্রসর চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী, পরিকল্পনাবিদ, গবেষক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশায় কর্মরত শীর্ষস্থানীয় ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকেও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। সকলের সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে সমৃদ্ধ দেশ ও আলোকিত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে বিএনপি ইতোমধ্যেই ‘ভিশন-২০৩০’ শিরোনামে একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার খসড়া প্রণয়ন করেছে। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই, অচিরেই ‘ভিশন-২০৩০’ চূড়ান্ত করা হবে।’

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের অগ্রসর চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী, পরিকল্পনাবিদ, সাংবাদিক, গবেষক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে ‘ভিশন-২০৩০’ চূড়ান্ত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আসবে

সারসংক্ষেপে খালেদা জিয়া বলেছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতায় দেশবাসী গভীরভাবে উপলব্ধি করছে যে, প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে। এর অবসানকল্পে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে।

সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট

রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সম্প্রদায়, প্রান্তিক গোষ্ঠী ও পেশার জ্ঞানী-গুণী ও মেধাবী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে সারসংক্ষেপে বিএনপি প্রধান উল্লেখ করেন।

২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ

খালেদা জিয়া বলেন, বাংলাদেশকে ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ করার লক্ষ্য নিয়ে এই রূপরেখা দেওয়া হবে। তখন মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার। এর জন্য বিএনপি বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ডাবল ডিজিটে উন্নীত করার সৃজনশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত উদ্যোগ গ্রহণ করবে।এ ছাড়া জবাবাদিহিমূলক রাষ্ঠ্রীয় ব্যবস্থার জন্যও করণীয় সম্পর্কে থাকবে রূপরেখায়।

‘ন্যায়পাল’ এর পদ ও কার্যালয় সক্রিয় করা

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ‘ন্যায়পাল’ এর পদ ও কার্যালয় সক্রিয় করা হবে। বাংলাদেশের জনগণের সব ধর্মাবলম্বী গোষ্ঠী, নৃ-গোষ্ঠী, পাহাড় ও সমতলবাসীসহ সবাইকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে একটি ‘রেইনবো নেশন’ গড়ে তোলা, রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সম্প্রদায়, প্রান্তিক গোষ্ঠী ও পেশার জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে জাতীয় সংসদে একটি উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হবে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের সম্মতি গ্রহণের পন্থা ‘রেফারেন্ডাম’ বা ‘গণভোট’ ব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃপ্রবর্তন করা হবে। প্র্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে সৃজনশীল, ইতিবাচক ও ভবিষ্যতমুখী এক নতুন ধারার সরকার ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণাও থাকবে। এ জন্য নতুন এক সামাজিক সমঝোতা বা চুক্তিতে উপনীত হতে উদ্যোগ নেবে বিএনপি।

গণভোট ও সমৃদ্ধ সমাজ

বিএনপি প্রধান বলেছেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জনগণের সম্মতি গ্রহণের পন্থা রেফারেন্ডাম বা গণভোট ব্যবস্থা সংবিধানে পুনঃপ্রবর্তন করা হবে। এ ছাড়া মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা পূরণে বাংলাদেশের সকল ধর্মবিশ্বাসের মানুষ, পাহাড় ও সমতলসহ সকল অঞ্চলের মানুষ এবং প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর মানুষের চিন্তা-চেতনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি জনকল্যাণমূলক, সহিষ্ণু, শান্তিকামী ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার কথা বলা হবে।

আঞ্চলিক ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় কানেকটিভিটি স্থাপন

খালেদা জিয়া বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও যোগাযোগ বাড়াতে কানেকটিভিটি স্থাপন, সম্প্রসারণ ও জোরদার করতে বলিষ্ঠ ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া, কোনো রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য সমস্যা সৃষ্টি না করা, বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া, প্রতিবেশী দেশসমূহের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশীসুলভ সোহার্দ্য, বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলা হবে।

পরিবেশ দূষণ রোধ

পরিবেশ দূষণ রোধ, জলবায়ু পরিবর্তন, দেশের অভ্যন্তরে প্রাপ্ত জ্বালানির সর্বোত্তম ব্যবহার, আবাসন খাতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত, ওয়াকফ সম্পত্তির পরিচালনা ও ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত, দেবোত্তর সম্পত্তিসমূহ হিন্দু শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী পরিচালনার জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করাসহ নতুন এক সামাজিক সমঝোতা বা চুক্তিতে উপনীত হতে বিএনপি উদ্যোগ নেবে বলেও জানান বিএনপি চেয়ারপারসন।

জঙ্গি দমন

ভবিষ্যতে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনে কঠোরতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে একযোগে কাজ করবে দলটি। বিএনপি মনে করে, সন্ত্রাসবাদ সব রাষ্ট্রের জন্যই হুমকির কারণ। এ কারণে বিএনপি বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মধ্যে কোনো রকম সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বরদাশত করবে না। বাংলাদেশের মাটি থেকে অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎরতাও মেনে নেওয়া হবে না।

বাতিল হবে সব কালা-কানুন

নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ করে সততা, দক্ষতা, মেধা, যোগ্যতা, দেশপ্রেম ও বিচার ক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসন, পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হবে। সব কালা-কানুন বাতিল করা হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং আটক অবস্থায় দৈহিক-মানসিক নির্যাতনের অবসান ঘটানো হবে। আটকাবস্থায় মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার জন্য তদন্তের ব্যবস্থা থাকবে। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের যোগ্যতা ও পদ্ধতিসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করবে বিএনপি।

স্থানীয় সরকারে বাজেট বরাদ্দ

স্থানীয় সরকারের অনুকূলে সরকারি বরাদ্দের অপ্রতুলতা এবং বৈষম্য নিরসনে জাতীয় বাজেটের একটি অংশ বরাদ্দ এবং আইন দ্বারা গঠিত একটি স্বাধীন কমিশনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে বরাদ্দ অর্থ বণ্টনের ব্যবস্থা করা হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থা

দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত, মেয়েদের জন্য স্নাতক এবং ছেলেদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, মেয়েদের শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারিত করা হবে।

কৃষি ব্যবস্থা

কৃষকদের জন্য শস্যবীমা চালু, অদক্ষ শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা হবে। সুষম, নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে যথোপযুক্ত প্রণোদনার মাধ্যমে গোটা কৃষি খাতকে পুনর্বিন্যাস ও বিকশিত, কৃষিতে অনিরাপদ এবং ক্ষতিকর উপকরণ ব্যবহার বন্ধ করা হবে।

 

janatarpratidin.com / Md. Bappy / Kukon/ Rokib/ 10 May 2017

 

 

সর্বশেষ