শিরোনাম

মানুষের মা, বাবা, ভাই, বোন সব আছে, কিন্তু আমাদের কি আছে?

সর্বশেষ আপডেটঃ ০৩:৪৭:৩৪ পূর্বাহ্ণ - ০৬ মে ২০১৭ | ৪৫২

হোসনে আরা (হিজড়া) বাবা মায়ের দেয়া নাম হোসেন আলী । তাড়াশ এলাকার হিজরা সমাজের গুরু মা তিনি। বয়স এখন ৪০ এর কঠায়। অল্প বয়সেই পরিবার থেকে অপবাদ নিয়ে বের হয়ে যেতে হয় তাকে। ‘হিজড়া’ হওয়ার কারণে নিজের পরিবারই প্রথম তাকে পরিত্যাগ করে ।

এত অল্প বয়সে পরিবার থেকে বের হয়ে হোসনে আরা পরবর্তীতে ‘হিজড়া’ সম্প্রদায়ের কাছেই আশ্রয় পায়। আর এখন পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র থেকে বৈষম্যের শিকার হয়ে পদে পদে অবহেলা আর বঞ্চনা নিয়ে বেঁচে আছেন তিনি। শুধু হোসনে আরাই নয়, তার মতো তাড়াশে আরো অনেকেই ‘হিজড়া’ হওয়ার কারণে পরিবার থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তাই তো পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও আজ অবধি সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে মৌলিক অধিকারটুকু চেয়ে পায়নি হোসনে আরা।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে খান পাড়ায় বসবাসরত হোসনে আরা কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, ‘আমি হিজড়া হওয়ায় আমার বাবা-মাকে দোষ দেব না। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজের মানুষের অনুভূতি এ জন্য দায়ী। আমি যখন স্কুলে যেতাম আমার পাশে কেউ বসতে চাইতো না সবাই হিজড়া বলে দূরে সরে যেত। রাস্তা দিয়ে চলার পথে সবাই হিজড়া বলে ডাক দিতো।

হোসনে আরা আরো বলেন, আমি যখন দেখলাম আমার কারণে আমার ছোট বোনদের বিয়ে হচ্ছে না। বিয়ে আসলে বরপক্ষ বলতো হিজড়া পরিবারে বিয়ে করাবো না। আমি মনে করলাম এর জন্য আমি দায়ী। তখন শুধু নিরবে কাঁদতাম আর কাঁদতাম। এরপর চলে আসি হিজড়া সমাজে। তাহলে আপনি বলুন দোষ কি সমাজের নয়?

তাড়াশে বসবাসরত হোসনে আরার আরেক জন শীর্ষ সাথী (হিজড়া) জানান, আমি এ হিজরা সমাজে আসার পূবে বাবা মা নাম রেখেছিলো আজিত।

এখন আমার নাম সাথী হিজড়া। আমাদের সরকার কর্মসংস্থান করে দিক এতো লাঞ্চনা আর মেনে নিতে পারছিনা। আমাদের কেউ বাসা ভাড়া দেয়না।

বেঁচে থাকার জন্য তো খাদ্য প্রয়োজন, আর এই খাদ্যের জন্যইতো মানুষের কাছে আমাদের যেতে হয়। কত জন কত উপহাস করে কথা বলে আমরা তাদের কিছুই বলতে পারিনা। অর্থ উপার্জনে ভালো-মন্দ যে কোনো একটি পথ বেছে নিতেই হয় মানুষকে। ভালো পথ হচ্ছে শ্রমের বিনিময়ে উপার্জন। আর হিজড়াদের নিজের প্রতিষ্ঠানে কাজ দেবেন এমন লোকের সংখ্যা এ সমাজে নেই বললেই চলে। তাহলে আমরা কি করে চলবো। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের বেছে নিতে হয় ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা শারীরিক অঙ্গ ভঙ্গি প্রদর্শন করে নেচে গেয়ে অর্থ উপার্জন করার পথ।

এ উপার্জনের পথেও সহ্য করতে হয় নানা দুঃসহ কটূক্তি আর উপহাস তাদের নিত্যদিনের অর্জন। শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসনসহ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার তারা।

নিজের বঞ্চনা আর অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়ে পপি ‘হিজড়া’ বলেন,‘আমাদের মূল সমস্যা, কাজ না পাওয়া। বাজার বা রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার কাজটাও পাই না। নিজের অধিকারটাও পাই না। আমরা কি মানুষ না?

তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ কাজ দিলেও যে টাকা দেওয়ার কথা, তার অর্ধেকও দেয় না’। যানবাহনে আমাদের নিতে চায় না। আদমশুমারিতে ‘হিজড়া’ হিসেবে গণনা করা হচ্ছে না। আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। কাজ পেলেই তো আমাদের জীবন চালানো অনেকটা সহজ হয়ে যায়। আমরা মানুষ হিসেবে অন্যদের মতো বাঁচতে চাই।”

হিজড়া জনগোষ্ঠীর আরেক সদস্য বর্ষা আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রত্যেক মানুষের মা আছে, বাবা আছে, ভাই আছে, বোন আছে, কিন্তু আমাদের কি আছে বলেন?

আমাদের তো সব থেকেও কিছু নেই। সত্যিই আমরা বড় অভাগা। সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সাহায্য ও মানুষের একটু সহানুভূতি পেলে আমরা বুকভরা দুঃখের মাঝেও সমাজের সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের মতো সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে পারতাম।

এ ব্যাপারে তাড়াশ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মোঃ আলাউদ্দিন বলেন, আমাদের তাড়াশ উপজেলায় এ বছর হিজড়াদের জন্য এখনো কোন বাজেট আসেনি। যে কোন সুযোগ আসলে আমরা অবশ্যই তাদের দেব। তবে জেলায় ৫০ জন হিজড়ার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে তার মধ্যে আমাদের তাড়াশ উপজেলারও কয়েকজন হিজড়া থাকবে।

 

janatarpratidin.com /Md. Bappy /06 May 2017

সর্বশেষ