শিরোনাম

কোটা সংস্কার: একজন শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত ও বিবিধ যুক্তিতর্ক!

সর্বশেষ আপডেটঃ ০৩:০৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ - ২৪ মার্চ ২০১৮ | ৭১৩

::মোঃ রকিবুল ইসলাম রকিব::

বাঙালির ইতিহাস হাজার বছরের শাসন শোষণ অন্যায় অবিচার আর তাঁর ন্যায্য অধিকার হরণের ইতিহাস!বাংলাদেশের ইতিহাস বাঙালির সকল অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাজপথে লড়াই, সংগ্রাম, আন্দোলনের ইতিহাস! তিরিশ লক্ষ শহীদের নিষ্পাপ রক্ত এবং দু’লক্ষ মা বোনের সর্ব সম্ভ্রমের বিনিময়ে রণাঙ্গনে দীর্ঘ ন’টি মাসে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসই সাড়ে ষোল কোটি গর্বিত বাঙালির ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের এক চিরন্তন শাশ্বত ইতিহাস!
আর কোটা প্রথার ইতিহাস তো খানিকটা আরো সমৃদ্ধ!

আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশে দু’শত বছরের সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ উপনিবেশের পর বৃটিশরা মধ্যিখানে ভারতকে রেখে অনেকটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সর্বোসক্ষম সাড়ে সাত কোটি মেধাবী বাঙালি জাতিকে(পূর্ব পাকিস্তান) শাসন বা পরিচালনার জন্য করে গিয়েছিলো পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য ঘৃণ্য প্রহসনের এক নীল আয়োজন!

আর তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তান যেনো এই সোনার বাংলার বাঙালির আত্মপরিচয়কে শুধু অস্বীকারই নয় রীতিমতো লুণ্ঠন করা শুরু করেছিলো! ভারতীয় উপমহাদেশের সম্পদশালী এই পূর্বভূমে যেনো পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনের নামে শোষণনীতি কায়েম হয়েছিলো,এসবে সবার মুখ খোলা তো একরকম বারনই ছিলো আর আন্দোলন সেতো একপ্রকার আধো তন্দ্রায় জেগে থাকা বাঙালির একেকটা হাস্যকর অলীক কল্পনা দেখার মতো!

ইতিহাস সাক্ষী দেয় তৎকালীন সময়ে চাকরিক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান করা হতো এবং পূর্ব পাকিস্তানের মেধাবীরা নির্বিকার বেকার পড়ে থাকতো তাদের মেধাকে অসাড় সর্বস্ব বলে অবমূল্যায়ন করা হতো! শুধু তাই-ই নয় বাঙালিদের বেটে, কালো ও অথর্ব বলে তুচ্ছজ্ঞান করা হতো! তাই বাঙালিরা তাঁদের কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনর্থক সর্বোক্ষেত্রে কেবল পিছিয়ে যেতে শুরু করে! পশ্চিমাদের এসব অসম আচরণ ছিলো মূলত পূর্ব পাকিস্তানের বিচক্ষণ বাঙালিদের মেধাহীন বা দ্বিধাগ্রস্ত করার এক নির্মম কৌশল মাত্র!

কিন্তু উপরে একজন তো আছেন যিনি সব দেখছেন! হয়তো বিশ্ব বিধাতারও পশ্চিম পাকিস্তানের সেদিনকার সে বলসর্বস্ব স্বেচ্ছাচারী এই বিমাতাসুলভ আচরণ বেশিদিন সহ্য হয় নি! তাই আজন্ম অধিকার বঞ্চিত তন্দ্রাচ্ছন্ন দিশাহীন সাড়ে সাত কোটি বাঙালি জাতিকে জাগ্রত করার জন্য এবং তাদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দ্বার খুলতে আলোকবর্তিকা হাতে সেদিন বিশ্ব বিধাতাই হয়তো তাঁকে পাঠিয়েছিলেন! যিনি বাঙালির অলীক স্বপ্নগুলোকে বাস্তবতায় রূপ দিয়েছেন একজন স্বার্থহীন মহামানব হয়ে যিনি সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে দীর্ঘ যুগ পথ দেখিয়েছেন! তিনি তো ভিনগ্রহের কোন ভিনদেশী কেউ নন তিনি তো বিজ্ঞানের কোন আশ্চর্য সৃষ্টি নন তিনি আপাদমস্তক পুরোদস্তুর এক সাধারণ বাঙালি! আর তিনিই হলেন এ শাশ্বত বাংলার অহংকারী মাটির এক মহান বীর সন্তান জাতির জনক “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান”।

আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই বাঙালির ইতিহাসের সেই প্রথম ব্যক্তি যিনি সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করে দীর্ঘ ২৩টি বছরের পশ্চিমা (পশ্চিম পাকিস্তান) কোটার শোষণ দূর্গ সংস্কার নয় বরং শেষ কুঠুরিটাও ভেঙে দিয়েছিলেন!

অতিতোষনের উল্লাসে পশ্চিম পাকিস্তানিরা যেদিন ভুলে গিয়েছিলো প্রকৃতির সেই বাস্তব সত্যটি যে- ‘মেধা বা প্রতিভা’ কখনোই কারো শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়ার নয়, ইটভাটার উত্তপ্ত কয়লায় পোড়ানোর বস্তুটি বা ময়লার স্তূপে ফেলে রাখার মতো কোন উচ্ছিষ্ট ফেলনা নয় সেদিন বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি ঠিকই বুঝিয়ে দিয়েছিলো প্রতিভা আজন্মই বিকশিত হয় আর মেধাই সর্বত্র কেবলই বিস্তার লাভ করে!

তাই কোটা সংস্কারের দাবি কোন অন্যায় আবদার নয়!

যেকোনো দাবি আদায় বা যৌক্তিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এমন কিছু বিষয় থাকে যা অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ বা অবকাশ থাকে না পাশাপাশি বাঙালির সকল ন্যায্য দাবি আদায়ে, তাদের কাম্য অধিকার প্রতিষ্ঠায়, প্রতিরোধ গড়ে তোলা বা যেকোনো প্রতিবাদ জানাতে ঐ রাজপথকে বেছে নেয়া যেনো বীর বাঙালির এক চিরন্তন সংস্কৃতি!

আর তাই যে যার অবস্থান থেকে আজ আপনারা যারা রাজপথে দেশের বিদ্যমান কোটা সংস্কারের আন্দোলনের শপথ করেছেন, আপনাদের সব্বাইকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে-

* সময়োচিত এবং যৌক্তিক দাবি আদায়ে এই অহংকারী বাংলা মায়ের ঐ পবিত্র রাজপথে সকলের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন কখনোই বৃথা যায় নি! ইনশাআল্লাহ আগামীতেও বৃথা যাবে না!
* আপনাদের দাবি দাওয়া সম্পর্কে সম্যক সচেতন থাকতে হবে
* আপনাদের মনে রাখতে হবে আমরা কোটা প্রথা বাতিল নয় বরং সংস্কারের নিমিত্তেই আন্দোলনে নেমেছেন!
* যিনি বা যারা আপনাদের এই দাবিগুলো বাস্তবায়ন করবেন তাদের কার্যপরিধি ও কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে আপনাদের বাস্তবসম্মত বিশদ ধারনা রাখতে হবে!
* আপনাদের এও মনে রাখতে হবে আপনার ঘর বাঁচাতে অনর্থক যেনো কারো উনুন না নেভে!
* দাবি আদায়ে আপনারা যেনো অতিউৎসাহী, নেহাত আগ্রাসী বা চরম স্বার্থপর না হন!
* মনে রাখতে হবে বাস্তবতা বিবর্জিত আন্দোলন আদতে কোনো আন্দোলনই নয় বরং একপ্রকার আহাজারি ওসব আন্দোলন তো শুধুই কেবল শুভঙ্করের ফাঁকি!

সর্বোপরি অনর্থক উদাসীন বা খুব বেশি বিচলিত না হয়ে যদি উপরোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে  নূন্যতম জ্ঞান রাখার পাশাপাশি একটুখানি বিচক্ষণতা বা সচেতনতার পরিচয় দিই তবেই না কেবল দাবির তালায় চাবি আসবে!
তবেই তো আন্দোলন স্বার্থক, সুন্দর ও সাফল্যমন্ডিত হবে নচেৎ সব যুক্তিহীন ব্যর্থ আর নিষ্প্রয়োজন আপনাদের এতসব বিশাল বিশাল রূপালি আয়োজন!

তাই বাস্তবতার নিরিখে একটু গভীরভাবে ভাবনা চিন্তা করলেই কিন্তু খুব সহজেই আপনাদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার গৃহিত সিদ্ধান্তের যথার্থতা ও যুক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায়! মাননীয় নেত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেছেন যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণ না হলে মেধাবীরা সুযোগ পাবে! তিনি কিন্তু তাঁর বক্তব্যে কেবলমাত্র মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছেন এছাড়া অদ্যাবধি তিনি কিন্তু কোথাও বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান অন্যান্য কোটার পক্ষে অথবা বিপক্ষে তাঁর মতামত বা অবস্থান তুলে ধরেন নাই!তাই আপনাদের অনর্থক হতাশ হওয়ার বা সরকারের বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই যুক্তিহীন বিশেদাগার করার তো কোনো যৌক্তিক কারণ দেখছিনা!

পক্ষান্তরে যারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐ বক্তব্যের পর আজকাল যারা খুব বেশি হতাশ হয়ে পড়েছে অথবা যারা নেত্রীর সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে অনর্থক সমালোচনা করছেন আমি বলবো তারা আদৌ কোনো কোটা সংস্কারবাদী নন,আন্দোলনের নামে বস্তুত তারা আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী সাড়ে ষোল কোটি বাঙালির প্রকৃত অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন!

 একটু ভাবুনতো-
* স্বাধীতোর পূর্ব সময়ে পশ্চিম পাকিস্তান যখন বাংলা ও বাঙালির ন্যায্য অধিকারগুলো হরণ করে বাঙালি মেধাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পশ্চিমা কোটায় যখন একের পর এক নিজেদের লোকগুলোর কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তখন বাঙালির মেধাবীদের কার্যকর মূল্যায়ন এবং অধিকার প্রতিষ্ঠায় কারা হাতে অস্ত্র তুলে যুদ্ধ করেছিলো, বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলো!

* আপনি যদি কোটা সংস্কারের পক্ষে আন্দোলনে সফল হয়ে নিজের মেধার যোগ্য মূল্যায়নের উপায়োন্তু খোঁজতে পারেন তবে কি ঐসব বীর মুক্তিযোদ্ধারা গোটা একটি দেশ স্বাধীন করে তাদের অনুজদের জন্য কিচ্ছু প্রত্যাশা করতে পারি না বৈকি!এতোটাও আত্ন স্বার্থভাবাপন্ন হবেন না আশা করি!

* যারা মুক্তিযুদ্ধো কোটায় কোন সরকারী চাকুরী বা সরকারের প্রদেয় অন্যান্য সুযোগ সুবিধাগুলো গ্রহণ করবেন তারা কি আদৌ উচ্চতর শিক্ষার বৈতরণী পার না করেই এইসব সুবিধাদি প্রাপ্ত হোন নাকি তাদের‌ও(মুক্তিযোদ্ধা কোটাধারী)আপনার আমার মতোই প্রাতিষ্ঠানিক(শিক্ষা প্রতিষ্ঠান)যোগ্যতার বা মেধার স্বাক্ষর বহন করতে হয়!

* যারা মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুফল ভোগ করেন তারা কি তাদের পূর্ব পুরুষদের কৃতকর্মের জন্য (মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন করা) কিঞ্চিত সুবিধাও প্রাপ্ত হবেন না!নাকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের মহান ভূমিকাটুকুও অস্বীকার করা হবে!এতটা অকৃতজ্ঞ অবিবেচক হ‌ওয়াটা একটি জাতি হিসেবে যথেষ্ট শোভন দেখায় কি!

প্রত্যাশা করছিঃ 
দেশরত্ন শেখ হাসিনার ভেতরকার অব্যক্ত না বলা কথাগুলোও কিছুটা হলেও আন্দাজ পারলেন!আর একজন মেধাবী হিসেবে হয়তো এটা বুঝতেও আপনার সামান্যতম কষ্ট হয়নি যে মাননীয় নেত্রী কেনো কোন ভূনিতা ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধা কোটার পক্ষে তাঁর অনড় বক্তব্য উপস্থাপন করলেন!
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা তাঁর ধমনীতে পিতা মুজিবের রক্ত‌ই বহন করেন আর স্বত্বায় অস্তিত্বে আজন্ম কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই বাস্তবায়ন করেন! তাই যে যাই বলুক তিনি বঙ্গবন্ধুর তনয়া বঙ্গকন্যা শেখ হাসিনা আর তিনি কখনোই অকৃতজ্ঞ অবিবেচক হতে পারেন না!
এখন উপসংহারে আপনিই বলুন
আপনি কি বঙ্গবন্ধু কন্যার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেবেন নাকি স্বাধীন বাংলাদেশের সকল সরকার প্রধানের রাজনীতির ইতিবৃত্তি পর্যালোচনা সাপেক্ষে শেখ হাসিনার উপর‌ই আস্থা রাখবেন!

আর প্রত্যাশা করি বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা কখনোই কোটার(মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যাতীত)কাষ্ঠতলে নিমজ্জিত করে মেধাবীদের আঁধার পথে বিপথগামী বা অনাহারী হতে দেবেন না!
বঙ্গকন্যা শেখ হাসিনাই কিন্তু বিশ্ব মানবতার মমতাময়ী “মা” তাই আপনি আমি আমরা একেকজন শেখ হাসিনার সন্তান বিনা ভিন্ন কিছু হতে পারি না!

বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা,
সাড়ে সাত কোটি বুভুক্ষু বাঙালিকে স্বপ্ন দেখা শিখিয়েছিলেন  পিতা_মুজিব
আজ সাড়ে ষোল কোটি মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার আপনিই শেষ স্বপ্ন প্রদীপ!

কোনো ভয়ে বীর বাঙালি কভুও ভীতু ন‌ই
কারন আপনি মোদের মা
তাই আপনার কাছে কিছু চাইতে সন্তান কভুও সংকোচ করেনা!

অতঃপর কোটা সংস্কারের আন্দোলন চলছে….. বৈষম্যভুলে কোটার বাস্তবিক সংস্কার একদিন হবেই!
ইনশাআল্লাহ……

জয় বাংলা     জয় বঙ্গবন্ধু
জয়তু- বঙ্গকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা
জয়তু- জাগ্রত মেধাবী সারাবাংলা

 

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ময়মনসিংহ জেলা।

সর্বশেষ
%d bloggers like this: