শিরোনাম

আসছে ৪ লাখ ২৬৬ কোটির বাজেট

সর্বশেষ আপডেটঃ ০৩:১৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ - ৩১ মে ২০১৭ | ৩৬০

আগামী অর্থবছরের বাজেটের সব প্রস্তুতি শেষ। আগামীকাল ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী। এদিকে ভ্যাট আইন নিয়ে অসন্তোষ বাড়ার মধ্যেই আবার ব্যাংকে আবগারি শুল্ক বাড়ানোর কথা ভাবছে সরকার। ফলে আসছে বাজেটটি হতে যাচ্ছে সন্তোষ-অসন্তোষের বাজেট।

গতকাল রাতেই বাজেটের কপি বই আকারে ছাপার জন্য সরকারি বিজি প্রেসে পাঠানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রস্তাব করা হচ্ছে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এক লাখ ৫৩ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার আগের বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টায় জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। মূলত জাতীয় নির্বাচন সমানে রেখে বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। এই বাজেট হবে বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে চতুর্থ বাজেট এবং অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এগারোতম বাজেট। এরশাদের আমলে দুটি বাজেট দিয়েছিলেন মুহিত।

এবারের বাজেটের সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা। ২০১২ সালে তৈরি করা এ আইন বাস্তবায়ন হবে ১ জুলাই থেকে। নতুন আইনে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কার্যকরের পাশাপাশি ব্যাংকে আবগারি শুল্ক দ্বিগুণ করতে যাচ্ছে সরকার।

নির্বাচনের আগে এটিই হবে বর্তমান সরকারের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট। অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিতের শেষ বাজেটও হতে পারে এটি। তিনি একাধিকবার বলেছেন, আর মন্ত্রী হচ্ছেন না। এজন্য এবারের বাজেটটি স্মরণীয় করে রাখতে চান অর্থমন্ত্রী। বিশাল এ বাজেটে  আয়-ব্যয়ের ব্যবধান কমানোর টার্গেট থাকবে। আয়ের পথ খুঁজতে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে।

অর্থবছর (২০১৭-১৮) শেষে এ খাতে ৮৭ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করছে সরকার। অর্থ বিভাগের তথ্যমতে, বাজেটের মূল আকার হতে পারে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। চলতি বাজেটের আকার ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা।

সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, এ আকার ৩ লাখ ১৭ হাজার ১৮০ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আদায় ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। আর উন্নয়ন বাজেট অর্থাৎ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করা হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪ কোটি টাকা; যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৩৮ দশমিক ৫১ শতাংশ বেশি।

‘সময় এখন আমাদের’ শিরোনামে আগামীকাল ১ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে জনকল্যাণমূলক উদ্যোগও থাকছে একাধিক। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানো হচ্ছে। এর আওতায় সব ধরনের ভাতার হার এবং সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশের জন্য নতুন বাজেটে করপোরেট করহার কমানোর পাশাপাশি করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসছে।

বাজেটে আয়: ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বিশাল বাজেটে বরাবরের মতোই অর্থের প্রধান খাত এনবিআর। লক্ষ্য ২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা; যা চলতি বাজেটের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। যদিও চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এনবিআরের টার্গেটের চেয়ে ১১ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। তবে আসছে বছরে নতুন আইন বাস্তবায়ন হলে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হবে। এতে এনবিআরের লক্ষ্য অর্জনে তেমন কোনো সমস্যা হবে না বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। শুধু ভ্যাট আদায় করেই ৮৭ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা প্রাপ্তির পরিকল্পনা করছে সরকার। যদিও ভ্যাট আইন নিয়ে এখনো বিতর্ক চলছে। ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে অর্থমন্ত্রী একাধিকবার ঘোষণা দিয়েছিলেন, ভ্যাটের হার কিছুটা কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনা হবে। তবে পরে তিনি সেই ঘোষণা থেকে সরে দাঁড়িয়ে আগের অবস্থানে ফিরে গেছেন। তাই নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন থেকেই ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট গুনতে হবে। প্রকৃতপক্ষে এই ভ্যাট পড়বে জনগণের ঘাড়ে। ফলে সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যতই ভ্যাট রেয়াত দেওয়া হোক না কেন, ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায়ের একটা নেতিবাচক প্রভাব দ্রব্যমূল্যের ওপর পড়বেই; যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করবে। ’

এডিপি: বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হচ্ছে ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা; যা ইতিমধ্যে অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্যে ৩৩ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে চলমান আট মেগা প্রকল্পের জন্য। পদ্মা সেতু, পদ্মা সেতুর রেলসংযোগসহ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ থাকছে। সর্বোচ্চ বরাদ্দের খাতগুলোর মধ্যে পরিবহন খাতে ৪১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যা এডিপির ২৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এরপর বিদ্যুৎ খাতে ১৮ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। শিক্ষায় ১৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়ণ খাতে ১৪ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে ১৪ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। পল্লী উন্নয়ন খাতে ১৩ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, জনসংখ্যা ও পরিবারকল্যাণ খাতে ১০ হাজার ২০১ কোটি টাকা। কৃষিতে ৬ হাজার ৬ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে এডিপিতে নতুন-পুরান মিলিয়ে প্রকল্প দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ৩১১টি।

বাড়ছে সামাজিক নিরাপত্তাবলয়: সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বাড়ছে। মাসিক ভাতা ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে এ কর্মসূচির আওতায় প্রতি বছর প্রায় ৬০ লাখ দরিদ্র লোকের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। নতুন অর্থবছরে আরও ৭ লাখ মানুষকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের বছরে দুটি উৎসব ভাতা দেওয়ারও সিদ্ধান্ত আসছে।

ঘাটতি বাড়ছে: নতুন বাজেটে ঘাটতি হবে মোট দেশজ উৎপাদনের (ডিজিপি) ৫ দশমিক ৪ শতাংশ; যা অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন। চলতি অর্থবছরে বাজেটে ঘাটতি রয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। আগামী বছর তা ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। আগামী বছর ব্যাংক খাত থেকে ৪৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে অর্থ বিভাগ। চলতি বাজেটে ৩৮ হাজার কোটি টাকা এ খাত থেকে নেওয়ার কথা থাকলেও আমদানি ব্যয় কমে যাওয়ায় এবং কাঙ্ক্ষিত হারে বিনিয়োগ না হওয়ায় এর প্রয়োজন পড়েনি। বরং আগের দেনা পরিশোধ করেছে সরকার। ঘাটতির বাকি অর্থ সঞ্চয়পত্র বিক্রি এবং বৈদেশিক সহায়তা ও অনুুদান খাত থেকে সংগ্রহ করবে সরকার।

বাড়ছে ভ্যাট রেয়াতের আওতা: নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতির চাপ উসকে দেবে। এমন আশঙ্কা যেন সত্যিতে পরিণত না হয়, এজন্য ভোগ্যপণ্যসহ বেশকিছু খাতে ভ্যাট ও কর রেয়াতের আওতা বাড়ানো হচ্ছে। এজন্য ১ হাজার ৩৪৯টি আমদানি পণ্যের ওপর থেকে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। জানা গেছে, নতুন ভ্যাট আইনে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিজাত পণ্য চাল, চিনি, ডাল, ভোজ্যতেল, চিকিৎসাসেবা, জীবন রক্ষাকারী ওষুধসহ বেশকিছু পণ্য ও সেবা খাতকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। এসব খাত ভ্যাটের আওতার বাইরে থাকায় জনগণ কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে।

সব ঠিক থাকলে ১ জুন জাতীয় সংসদে মাল্টি মিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে বাজেট উপস্থাপন করা হবে। ব্যাপকভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি ওয়েবসাইট লিংক www.bangladesh.gov.bd, www.nbr-bd.org, www.plancomm.gov.bd, www.imed.gov.bd, www.bdpressinform.portal.gov.bd, www.pmo.gov.bd থেকে বাজেট ডকুমেন্ট ডাউনলোড করা যাবে।

 

janatarpratidin.com / Md. Bappy / 30 May 2017

 

সর্বশেষ
%d bloggers like this: