শিরোনাম

আনন্দ মোহন কলেজের গণিত বিভাগের অধ্যাপক “ড. রাধা বিনোদ পাল”- জাপানিদের কাছে দেবতুল্য।

সর্বশেষ আপডেটঃ ০৩:৩৫:৪৩ পূর্বাহ্ণ - ০৭ এপ্রিল ২০১৮ | ৩৬৮

মোঃ রকিবুল ইসলাম রকিব

সভাপতি, ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগ

শতবর্ষের ঐতিহ্যে লালিত আনন্দ মোহন কলেজ বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কলেজগুলোর অন্যতম। এ কলেজের রয়েছে এক সমৃদ্ধ ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। যেহেতু আমি আনন্দ মোহন কলেজের ছাত্র সেই কৌতুহলের বসে একদিন কলেজের সিনিয়র স্যারদের সাথে আলাপচারিতায় আমার জিজ্ঞাসা অত্র কলেজ থেকে বের হয়ে যাওয়া কৃতিত্ব অর্জন কারী ব্যক্তিদের কথা,- সামাজিক, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ক্ষতি অর্জনকারীদের বেশ কয়েক জনের নাম ওঠে আসলো তাদেরই একজন হল  রাধা বিনোধ পাল।সেই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ দিন ধরে ভাবছি “রাধা বিনোধ পাল” কে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি লিখবো আর সেখান থেকেই আমার তথ্য সংগ্রহ শুরু করা-

সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত কুষ্টিয়া জেলা। এরই একটি অবহেলিত উপজেলা  মিরপুর। যেখানে আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক ড. রাধাবিনোদ পাল, কবি দাঁদ আলী, নীল বিদ্রোহী প্যারী সুন্দরী ও ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রের মত অসংখ্য জ্ঞানী ও গুনি ব্যাক্তির জন্মভূমি।যা কালের সাক্ষী হিসেবে এখনও তাঁদের স্মৃতি চিহ্নের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। ইটের গায়ে আজও লেখা রয়েছে আর বি ডি (রাধা বিনোদ পাল)। শান বাঁধানো ঘাটটি কালের আবর্তে ভেঙে পড়েছে। দেশ স্বাধীনের পর একতলা বাড়িটি ক্ষয়ে ক্ষয়ে হারিয়ে গেছে। কিন্তু আজও তাঁর নাম সবাই জানতে চায় চাকরিজীবনের সুনাম, খ্যাতি তাঁকে দিয়েছে বিশ্বপরিচয়।

তিনিই তো হাজার বছরের অন্যতম একজন শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী।প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব ড. রাধা বিনোদ পালের সুখ্যাতি শুধু পাকিস্তান-ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নিন্মে সংগৃহীত তথ্যের আলোচনা করা হলঃ

জন্মঃ ১৮৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার খাস-মথুরাপুর ইউনিয়নের তারাগুনিয়ার মাতুতালয়ে।বাবার নাম বিপিন বিহারী পাল। মায়ের নাম মগ্নময়ী দেবী। ঠাকুর দার নাম ফ্যালান চন্দ্র পাল। (গৌতম কুমার রায়ের – ডঃ রাধা বিনোদ পালের শৈশবকাল )।

পৈত্রিক নিবাসঃ বাবার বাড়ি মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের অখ্যাত গ্রাম কাকিলাদহের বর্তমানে জর্জ পাড়ায়। বিপীণ বিহারী পালের ছেলে ড. রাধা বিনোদ পাল। বাবা ছিলেন দরিদ্র। রাধা বিনোদ পালের বয়স যখন মাত্র ৩ বছর তখন তিনি মারা যান। মতান্তরে তিনি সন্যাসব্রত গ্রহণ করে সংসারত্যাগি হন। (গৌতম কুমার রায়ের – ডঃ রাধা বিনোদ পালের শৈশবকাল )।

বেড়ে ওঠাঃ  অকাল বিধবা মা মাত্র ৩ বছরের শিশুকে নিয়ে স্বামীর দাদা বৈদ্যনাথ ও কালীনাথ পালের আশ্রয়ে উঠেন। কিন্তু বেশি দিন তিষ্ঠোতে পারেন নি। সাড়ে ৪ বছরের শিশু সন্তান রাধা বিনোদ পালকে নিয়ে মা স্বামীর ভিটে ছেড়ে চলে যান চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুমারী গ্রামে। কুমারী গ্রামের দুর্সম্পর্কের আত্মীয় বাড়িতে থেকে ঝি’র কাজ করতেন মা। আর শিশুপুত্রের কাজ জোটে ওই গেরস্থের বাড়িতে মাহেন্দার রাখালের।

শিক্ষাজীবনঃ জীবন সংগ্রামের পাশাপাশি এগিয়ে যায় তাঁর শিক্ষা জীবন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের শুরু কুমারী গ্রামের পাঠশালায়। সেখানে সহপাঠিদের চেয়ে অনেক মেধার পরিচয় রাখেন তিনি। এলাকায় কথিত আছে – ওই পাঠশালায় তিনি ৩ বছর পড়ালেখা করেন। এরপর তিনি পার্শ্ববর্তি বাঁশবাড়িয়া গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি হন। তাঁর অমিত প্রতিভার স্বাক্ষর দেখতে পেয়ে এ সময় অনেকেই সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন। এরপর ভর্তি হন কুষ্টিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। তিনি কুষ্টিয়ায় এক বোর্ডিং-এ অবস্থান করে পড়তেন। সে সময় তিনি পার্ট টাইম বার্বুর্চিগিরি করে বোর্ডিং-এ থাকার খরচ যোগাড় করতেন। এ বিদ্যালয় থেকে ১৯০৩ সালে তিনি মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। পরীক্ষায় তাঁর অসামান্য ফলাফল পুরো নদীয়া জেলায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ঈর্ষনীয় সাফল্যের সাথে তিনি রাজশাহী ওল্ড কলেজে। ১৯০৫ সালে এ কলেজ থেকে ডিস্টিকশনসহ এফএ পাশ করেন। ১৯০৮ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সিয়াল কলেজ থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণীতে (সন্মান) উত্তীর্ণ হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১ম শ্রেণিতে এমএসসি ডিগ্রী লাভ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯২০ সালে আইন বিষয়ে ১ম শ্রেণিতে ১ম হয়ে স্নাতকোত্তর ও ১৯২৫ সালে আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। বৃত্তির সন্মানির অর্থে তিনি শিক্ষাজীবনের বেশিরভাগ ব্যয়ভার নির্বাহ করতেন।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবনঃ দরিদ্র পরিবারের অনাথ সন্তান হিসেবে শিশু বয়স থেকেই শুরু তাঁর কর্মজীবনের। মাহেন্দার রাখাল হিসেবে গেরস্থের বাড়ি কাজ করেই তাঁকে সংসার দেখতে হত শিশুকালেই। তিনি গণিতে অনার্স পাশ করার পর ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ১৯১১-১৯২০ সাল পর্যন্ত ৯ বছর অধ্যাপনা করেন। ১৯২০ সালে আইনে স্নাতকোত্তর পাশের পর তিনি আনন্দমোহন কলেজে অধ্যাপনা ছেড়ে হাইকোর্টে আইন ব্যাবসা শুরু করেন।

আইন পেশায়ও তিনি অল্প দিনেই বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন বলে জানা যায়। এ সময় তিনি ইউনিভার্সিটি ল কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। ১৯৪১-১৯৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক ছিলেন। এরই মাঝে তিনি ১৯২৫-১৯৩০ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠাকুর আইনে অধ্যাপনা করেন। ১৯৪৪-১৯৪৬ সাল অবধি তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যাঞ্চেলর – ভিসি’র দায়িত্ব পালন করেন। একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা আরেকবার হাইকোর্টের বিচারপতি – এই দুই ধরনের পেশায় বার বার তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেছেন –“ law and mathematics are no so different after all”. সম্পর্কে এরপর ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে তিনি ১৯৪৬ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক নিযুক্ত হন। তিনি আজীবন বিপুল কর্মযজ্ঞের সুমহান পুরোহিত ছিলেন।

কৃতিত্বঃ আইন পেশায় নিয়োজিত থেকে ১৯১৩ সালে প্রণীত ভারতবর্ষের আয়কর আইনের সময়োপযোগী সংস্করণ করেন। ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সরকারের আয়কর আইন-সংক্রান্ত উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৪১-৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। আবারও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যান। ১৯৪৩-৪৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪১ – ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৩৭ সালে ইন্টারন্যাশনাল একাডেমী অব কম্পেরেটিভ ল’র যুগ্ন সভাপতি হন (গবেষক প্রবীর বিকাশ সরকারের প্রবন্ধ থেকে)। ১৯৫২ সালে জাতিসঙ্ঘের আইন কমিশনের সদস্য, ১৯৫৪ সালে ভাইস চেয়ারম্যান ও ১৯৫৮ সালে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে দ্বিতীয় বারের মত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সাল অবধি তিনি জাতিসংঘের আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ওয়াল্ড ফেডারেশন মুভমেন্ট’র প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন (গবেষক প্রবীর বিকাশ সরকারের প্রবন্ধ থেকে)। এমনকি জাতিসংঘের এ গুরু দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালনের পাশাপাশি তিনি ১৯৫৭ সালে হেগে অনুষ্ঠিত “ আন্তর্জাতিক ন্যায়-বিচার আদালতের” বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন ( ভারত বিচিত্রা – জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যা, ২০১৬)।

রচিত গ্রন্থাবলিঃ তিনি আইন সম্পর্কিত বহু গ্রন্থের রচয়িতা। ১) International Military Tribunal for the Far East: Dissentient judgment-1953 ২) Lectures on universal declaration of human rights -1965 ৩) The History Of The Law Of Primogeniture 1929 [Hardcover]2015 এই তিনটি মূলবান গ্রন্থ পৃথিবীর প্রায় দেশেই পাওয়া যায়। এছাড়া crimes in international relation, Dissentient judgement of judgetice নামে আরও ২টি গ্রন্থ বাজারে দেখা যায়।

যে অসামান্য কর্ম তাকে সুখ্যাতির স্বর্ণ শিখরে পৌঁছে দেয়ঃ ২য় বিশ্বিযুদ্ধে জার্মান আর জাপানের পরাজয় হলে এই দেশ দু’টির যুদ্ধের কুশীলবদের বিচারের জন্য যুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক আদালতের দুটি ট্রাইব্যুনাল গঠণ করা হয়। একটি জার্মানির নুরেমবার্গে ও অন্যটি জাপানের টোকিওতে। হিটলারের যুদ্ধবাজ মন্ত্রিদের বিচার করা হয় নুরেমবার্গের ট্রাইব্যুনালে। আর জাপানের সমরবীদ জেনারেল হিদেকী তোজোর বিচার করা হয় টোকিও ট্রাইব্যুনালে । এ ২টি ট্রাইব্যুনালে বিশ্বের মোট ১১ জন জাঁদরেল বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের একজন ছিলেন ডঃ রাধা বিনোদ পাল। এশিয়া মহাদেশের একমাত্র বিচারক ছিলেন তিনি। ডঃ রাধা বিনোদ পাল টোকিও ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৪৬- ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত চলে এ বিচারকার্য। বিচারের একপর্যায়ে রাধা বিনোদ পাল বাদে অন্য সব বিচারপতি জেনারেল তোজোকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করে ফাঁসিতে ঝুলানোর সিদ্ধান্ত নেন। অন্যান্য বিচারপতির ধারণা ছিল, বিচারপতি পালও মিত্রশক্তির পক্ষে অনুগত থাকবেন। কিন্তু বিচারপতি রাধা বিনোদ পালের ৮শ’ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক রায় মিত্রশক্তি এমনকি বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। ((গৌতম কুমার রায় তার “ ডঃ রাধা বিনোদ পালের শৈশবকাল” প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন ওই ঐতিহাসিক রায় ছিল ১২৩৫ পৃষ্ঠার )।

আইনের শাসনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল বিচারপতি পাল কর্তৃক পূর্ববর্তী রায়কে বিতর্কিত প্রমাণ করে অকাট্য যুক্তি দেন। তিনি মিত্রশক্তির পক্ষে রায় প্রদানকারি ৪ বিচারপতির রায়কে বিতর্কিত প্রমাণের জন্য ৩ টি বিষয় উপস্থাপন করেন।

(ক) মিত্র শক্তির তিন প্রধান কর্তৃক স্থায়ী শাস্তির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দ্রুত স্তিমিতকরনে প্রথাগত অস্ত্রের অনুশীলন সম্পর্কিত ঘোষনা।

(খ) আন্তর্জাতিক আইনের সংযম ও নিরপেক্ষতার নীতিমালা লংঘন।

(গ) জাপানের আত্মসমর্পনের ইঙ্গিত উপেক্ষা করতঃ ভয়ানক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টিকারী আনবিক বোমা ব্যবহার।মূলতঃ আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারকার্য তাকে বিশ্বজোড়া সুখ্যাতি এনে দেয়।

সন্মানঃ তিনি জাপান-বন্ধু ভারতীয় বলে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৬৬ সালে রাধাবিনোদ পালকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি প্রদান করা হয় নিহোন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে। এমনকি জাপান বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি রিসার্চ সেন্টার রয়েছে তাঁর নামে। তিনি জাপান সম্রাট হিরোহিতোর কাছ থেকে জাপানের সর্বোচ্চ সম্মানীয় পদক ‘কোক্কা কুনশোও’ গ্রহণ করেছিলেন। জাপানের রাজধানী টোকিও’র অন্যতম বৃহত ও ব্যস্ত সড়ক তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে। এখানেই বিচারকের গাউন পরিহিত এই কিংবদন্তীতুল্য ব্যক্তিত্বের আবক্ষচিত্র জাপানিদের গর্বিত এক প্রতীক হিসেবে শোভা পাচ্ছে। এমনকি কিয়োটো শহরে তাঁর নামে রয়েছে জাদুঘর, সড়কের নাম ও আরেকটি স্ট্যাচু । টোকিও ট্রায়াল টেলিসিরিয়ালটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের ট্রায়াল নিয়ে নির্মিত হলে তাঁর চরিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন ভারতীয় অভিনেতা ইরফান খান। ( ভারত বিচিত্রা – জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যা, ২০১৬)।

সন্তান-সন্ততি  তিনি ৯ কন্যা ও ৫ পুত্রের গর্বিত জনক ছিলেন। কন্যারা হলেন যথাক্রমে – শান্তি রানী পাল, আশা রানী পাল, লীলা রানী পাল, বেলা রানী পাল, নীলিমা রানী পাল, রমা রানী পাল, রেনুকণা রানী পাল, লক্ষ্মী রানী পাল ও স্মৃমিকণা রানী পাল। পুত্রেরা হলেন যথাক্রমে – প্রশান্ত কুমার পাল, প্রদ্যূত কুমার পাল, প্রণব কুমার পাল, প্রতীব কুমার পাল ও প্রতুল কুমার পাল। প্রণব কুমার পাল ব্যারিস্টার। এছাড়া এক জামাই ডঃ দেবীপ্রসাদ পাল ভারতের সর্বোত্তম আইনজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। তিনি বিধানসভার ৩ বারের নির্বাচিত সদস্য।

জাপনের সাধারণ মানুষও ড রাধা বিনোদ পালকে কতটা আপন ভাবেন, নিচের গল্প থেকে তার কিঞ্চিত পরিচয়ঃ

২০০৭ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত শান্তি সভায় যোগ দিতে এসেছিলেন জাপানের ইতিহাস গবেষক অধ্যাপক ওওৎসুকা। তিনি আয়োজকদের বার বার অনুরোধ করেন ড রাধা বিনোদ পালের কোন বংশধরের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দিতে। সে সময় জাপানি গবেষকের অনুরোধে ডঃ রাধা বিনোদ পালের জামাই ডঃ দেবীপ্রসাদ পালের সাথে তার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়। ডঃ দেবীপ্রসাদ পাল ভারত বিখ্যাত আইনজ্ঞ ও লোকসভার ৩ বারের নির্বাচিত সদস্য।(গবেষক প্রবীর বিকাশ সরকারের প্রবন্ধ থেকে)। তাঁর এ রায় জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রি বই আকারে প্রকাশ করেন। জাপান, ইংলিশ ও জার্মানী ভাষায়। এটি জাপানে “শিক্ষামূলক মহা ইতিহাস গ্রন্থ” হিসেবে খ্যাত। ( ভারত বিচিত্রা – জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সংখ্যা, ২০১৬)। বর্তমানে বিখ্যাত রায়টি কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড ও হাভার্ডসহ পৃথিবীখ্যাত নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও আইন প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়।(গৌতম কুমার রায়ের – ডঃ রাধা বিনোদ পালের শৈশবকাল )।

১৯৫৯ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ উপাধি প্রদান করেন। এ বছরই তাকে ব্যবহারিক শাস্ত্রের জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত করেন। তিনি হিন্দু দর্শন আইন, বৈদিক যুগ, তামাদি আইন, আয়কর আইন, পূর্বাধিকার আইন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অধ্যয়ন ও বৈদিক যুগ হিন্দু আইনের ইতিহাস নিয়ে অনেক কাজ করেন। তিনি পৃথিবীর বহু দেশে আইন বিষয়ক  আন্তর্জাতিক সভায় সভাপতিত্ব করেন। জানা যায়, রাধা বিনোদ পালের ডকুমেন্টারি তৈরির জন্য কাকিলাদহে জাপানের এনএইচকে টেলিভিশনের পরিচালক তরুতাকাজি, প্রকৌশলী দাই সহাকুরা, টেকনিশিয়ান সিংজিজু বাংলাদেশে এসেছিলেন। এ ছাড়া জাপান সরকারের প্রতিনিধিরা স্মৃতিবিজড়িত এ জায়গায় অত্যাধুনিক হাসপাতাল , মিউজিয়াম সহ একাধিক স্থাপনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। স্থানীয় প্রভাবশালীমহলের দৌরাত্বে সেগুলো সম্ভব হয়নি।

মৃত্যুঃ তিনি ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি কলকাতাস্থ বাড়ীতে এই বিশ্বজনীন ব্যক্তিত্বের জীবনসন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে।

 

সর্বশেষ
%d bloggers like this: