শিরোনাম

স্বার্থের কাছে মানবতা যেখানে বিলীন

সর্বশেষ আপডেটঃ ০২:১১:২০ পূর্বাহ্ণ - ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ১৪৭

মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর ইতিহাসের বর্বরোচিত নির্যাতন বিশ্ব জনতাকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে। সেখানে পুড়ছে ঘর, মরছে রোহিঙ্গা মুসলমান, ধর্ষিত হচ্ছে মা-বোন, প্রাণ বাঁচাতে ছুটে আসছে বাংলাদেশে। আসার পথেও গুলি আর মাইন বিস্ফোরণে অকালে ঝড়ে যাচ্ছে প্রাণ। এক নিধারুণ পরিবেশে ভারী হচ্ছে বাতাস। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতনে ভারত, চীন ও রাশিয়ার বিবৃতি একই স্থানে আবিষ্কার করায় স্বার্থের কাছে মানবতা যেন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কি সেই স্বার্থ দেশ তিনটির যে, বিবৃতিতে একই সুরে কথা বলতে হবে?

এর জবাবে যতটুকু জানা যায়, মিয়ানমারে উভয় দেশেরই উচ্চ মাত্রার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। খনিজসম্পদ, বনভূমিতে সমৃদ্ধ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত স্থানে থাকার কারণে উভয় দেশই মিয়ানমারের আস্থা অর্জন করতে প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। উভয় দেশেরই লক্ষ্য হাসিলের জন্য মিয়ানমার সরকারের সমর্থন প্রয়োজন। রাশিয়াও কি সেই সুযোগই খুঁজছে।

এক হিসাবে দেখা যায়, মিয়ানমারে এরই মধ্যে বিপুল প্রভাব বিস্তার করেছে চীন। দেশটিতে অন্যসব দেশের বিনিয়োগ বিপুলভাবে ছাড়িয়ে গেছে চীন। ১৯৮৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ১২৬টি প্রকল্পে চীন বিনিয়োগ করেছে ১৫ বিলিয়ন ডলার। এ পরিমাণ পাশ্চাত্য বিনিয়োগের চেয়ে অনেক বেশি। ইইউ ওই একই সময় মাত্র ৬ বিলিয়ন ডলারেরও কম বিনিয়োগ করেছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সিআইটিআইসি গ্রুপ হল কিয়ুক পিয়ু বন্দরের প্রধান উন্নয়নকারী। এর সাথে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাও রয়েছে। এতে মিয়ানমারের সবচেয়ে গরিব অঞ্চল রাখাইন রাজ্যে এক লাখ চাকরি সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে রাখাইন রাজ্যের সিত্তুইয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে ভারত। মিয়ানমারের মাধ্যমে মিজোরাম থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত একটি রাস্তা নির্মাণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাও রয়েছে ভারতের।

অবশ্য চীনের তুলনায় মিয়ানমারে ভারতের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বেশ কম। তবে ভারত উভয়টাই ব্যাপকভাবে বাড়াতে চাচ্ছে। ২০১৫-১৬ সালে ভারত-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল ২.০৫ বিলিয়ন ডলার। অনুমোদিত প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ৭৩০ মিলিয়ন ডলার। ২২টি ভারতীয় কোম্পানি এ অর্থ বিনিয়োগ করেছে মিয়ানমারে।

রাখাইন রাজ্যের সহিংসতার ব্যাপারে ভারত ও চীন উভয়েই উদ্বিগ্ন। রাজ্যটিতে মুসলিম জনসংখ্যা ৪৫ ভাগ। তবে ভিন্ন মতালম্বীদের সাথে আলোচনা বা সমন্বয় সাধন করে নয়, বরং বৈশ্বিক ইসলামী সন্ত্রাসের সাথে সম্পর্কযুক্তদের’ বিরুদ্ধে কড়া সামরিক পদক্ষেপেই সমাধান বলে তারা উভয়ে বিশ্বাস করে।
রাখাইনে রোহিঙ্গা ইস্যু প্রশ্নে কোনো ব্যাপারেই দেশ দুটি একই অবস্থানে না থাকলেও উভয়েই রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে ‘বৃহত্তর ইসলামী সন্ত্রাসী’ তৎপরতার অংশ হিসেবে দেখছে। দুই দেশের কেউ একে গণহত্যার কাছাকাছি পর্যায়ের মানবিক ট্রাজেডি হিসেবে বিবেচনা করছে না।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি মিয়ানমার সফরের সময় অং সান সু চির সাথে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের অবস্থান সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। চলতি সপ্তাহের প্রথম দিকে তিন দিনের সফরশেষে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও মিয়ানমার যে একই অবস্থানে রয়েছে তা নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। রাখাইন রাজ্যে চরমপন্থীদের সহিংসতা, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সহিংসতা এবং নিরীহ জীবন যেভাবে আক্রান্ত হয়েছে তাতে আপনার উদ্বেগের সাথে আমরা একমত।

সু চি তার বক্তব্যে বলেন, সম্প্রতি মিয়ানমার যে সন্ত্রাসী হুমকির মুখে পড়েছে, সে ব্যাপারে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করায় আমরা ভারতকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আমরা একত্রে নিশ্চিত করতে পারি যে. সন্ত্রাসবাদকে আমাদের মাটিতে কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলোর মাটিতে শেকড় গাড়তে দেয়া হবে না।

মোদির সফরের পর ইস্যু করা যৌথ বিবৃতিতে দুই নেতা বলেন, তারা তাদের সীমান্তে বিরাজমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন, তারা তাদের নিজ নিজ ভূখন্ডে সন্ত্রাসবাদ এবং চরমপন্থী-উদ্দীপ্ত সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, সন্ত্রাসবাদ এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি অন্যতম হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে- এটা স্বীকার করে দুই পক্ষ সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করছে এবং একমত হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সন্ত্রাসী, সন্ত্রাসী সংগঠন ও নেটওয়ার্ককে টার্গেট করে নয় বরং সেইসাথে যেসব রাষ্ট্র ও সত্ত্বা সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করছে, সমর্থন করছে বা অর্থ দিচ্ছে, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে তাদেরও চিহ্নিত করা প্রয়োজন। উভয় পক্ষ একমত, সন্ত্রাসবাদ মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, এ কারণে সন্ত্রাসীদের কোনোভাবেই শহিদ হিসেবে গৌরাবান্বিত করা উচিত নয়।

তবে এ ব্যাপারে চীন সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বিবৃতি ইস্যু করা না হলেও রাষ্ট্রীয় মালিকানার পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস নোবেলজয়ী পাকিস্তানি মালালা ইউসুফজাইয়ের মিয়ানমার নেত্রী অং সান সু চি’র সমালোচনার সমালোচনা করতে রাখঢাকের পরোয়া করেনি। পত্রিকাটি জানায়, মিয়ানমার এবং পুরো অঞ্চলে ইসলামী জঙ্গিরা যে বিপদের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে তা না বুঝেই মালালা এ বক্তব্য রেখেছেন।

বিশ্লেষক লিউ লুলু বলেন, রোহিঙ্গা নিয়ে মিয়ানমারে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সে ব্যাপারে ভুল তথ্যের কারণেই মালালা এ বক্তব্য দিয়েছেন।
আরেকজন নোবেলজয়ীকে আক্রমণের আগে মালালার উচিত ছিল রাখাইন সহিংসতার মূল তথ্য অবগত হওয়া। সঙ্কটটির সৃষ্টি হয়েছে মুসলিম চরমপন্থীদের মিয়ানমার সরকারি বাহিনীর ওপর সহিংস হামলার প্রেক্ষাপটে। প্রতিশোধ নেয়ার জন্য সরকারি বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

লিউ বলেন, সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ জনসংখ্যার মধ্যে জাতিগত ও ধর্মীয় সঙ্ঘাত অনেক দিন ধরেই বিরাজ করছিল। মালালা সম্ভবত অবগত নন যে, তার নিজের দেশের অনেক ইস্যুর মতো রোহিঙ্গা সঙ্কটটিও অত্যন্ত জটিল বিষয়। এটা অল্প সময়ের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়।
চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের হামলার তাৎপর্য বুঝতে পারছেন না মালালা। মিয়ানমার পরিস্থিতি সম্পর্কে তার আরো কিছু জানা দরকার।

রোহিঙ্গা সংকটকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় দাবি করে দেশটিতে বাইরের হস্তক্ষেপের বিপক্ষে নিজেদের অবস্থানের কথা জানিয়েছে রাশিয়া।
১৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের উদ্যোগ শুধু ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে।

মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভাকে উদ্ধৃত করে রুশ বার্তা সংস্থা তাস জানায়, এটা মনে রাখা দরকার যে, একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার ইচ্ছা কেবল আন্তঃধর্মীয় বিরোধ বাড়িয়ে দিতে পারে।

তবে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এই নৃশংসতার নিন্দা জানিয়েছে। মিয়ানমারকে অবিলম্বে সেনা অভিযান স্থগিত ও রোহিঙ্গাদের প্রতি সহিংসতা বন্ধের আহবান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

ওই আহবানের পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অতিরিক্ত সহিংসতার খবরে উদ্বেগ জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়। নিরাপত্তা পরিষদে যেকোনো প্রস্তাব আটকে দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের মধ্যে মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত চীনের সঙ্গে রাশিয়াও রয়েছে। রাশিয়ার এ বক্তব্যের আগে রোহিঙ্গা সংকটের জন্য এই মুসলিম জনগোষ্ঠীকেই দায়ী করেছিলেন ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিং চিয়াং।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, মিয়ানমারে সংকট সমাধানে ধর্মীয় নেতাদের আলোচনার উদ্যোগ এগিয়ে নেয়ার পক্ষে মস্কো। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের বহু জাতিগোষ্ঠীর মুসলিম কমিউনিটিকে প্রতিনিধিত্বকারী শীর্ষস্থানীয় সংগঠনগুলোর যৌথ বিবৃতিকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি, যারা ওই এলাকায় (রাখাইন) সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। আমরা সরকারের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছি এবং ওই ধর্মের অনুসারীদের প্রতি উগ্রপন্থিদের উসকানিতে ঝাপিয়ে না পড়ার আহবান জানাচ্ছি।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরুতে সমালোচিত হলেও এখন বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা৷ তারা মনে করছেন, বাংলাদেশ বিশ্ব মানবিক জনমত গড়েছে৷ পেরেছে বিশ্বকে অমানবিকতা অনুধাবন করাতে।

এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বাড়িতে আগুন দেয়ার স্যাটেলাইট দৃশ্য প্রকাশ করেছে৷ বলেছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ‘পরিকল্পিতভাবেই’ রোহিঙ্গা মুসলিমদের গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে। স্যাটেলাইট থেকে তোলা রাখাইন রাজ্যের অনেক ছবি বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি জানায়, গত তিন সপ্তাহে আশিটিরও বেশি জায়গায় বিশাল এলাকা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এ কাজ করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, রোহিঙ্গা নির্মূলের জন্য ‘স্কর্চড আর্থ’ বা ‘পোড়া মাটি কৌশল’ অবলম্বন করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী৷ এ কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলো একের পর এক জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং যারা পালাতে চাচ্ছেন তাদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে মিয়ানমার সরকার বুধবার দাবি করেছে, ক্লিয়ারেন্স অপারেশনে রোহিঙ্গাদের প্রায় ৪০ শতাংশ গ্রামকে টার্গেট করে সেনাবাহিনীর অভিযান পরিচালিত করা হচ্ছে। ৪৭১টি গ্রামের মধ্যে ১৭৭টি গ্রাম জনশূন্য এবং ৩৪টি আংশিকভাবে পরিত্যক্ত।

উল্লেখ্য, অভিযানের নামে নির্যাতনের মুখে ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে এসেছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা বাংলাদেশে ১০ লাখ লোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসার আশঙ্কা করছে। প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার রোহিঙ্গা আসছেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং উদ্যোগের কারণে ইউএনএইচসিআর ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সহায়তা পাঠাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান গণমাধ্যমকে বলেন, শুরুতে দ্বিধা থাকলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে এখন বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট। এই স্পষ্ট অবস্থান নিতে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছে জনমতের চাপ এবং দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম। মিয়ানমারকে ঘিরে চীন ও ভারতের যে কর্পোরেট স্বার্থ, সেখান থেকে তাদের অবস্থানেরও পরিবর্তন হতে পারে জনমতের চাপে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বর্তমান সংকট একটি মানবিক সংকট। মানবিক সংকটের কোনো দেশ, ধর্ম বা বর্ণ নেই৷ সেই দিক থেকে একটি বিশ্ব জনমত তৈরি হয়েছে রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে। সেই মানবিক চাপ সরকারগুলোকে প্রভাবিত করছে, মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যাই হোক না কেন। রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দেয়ার ফলে একটা ‘সেন্স অফ ইউনিটি’ তৈরি হয়েছে। পাঁচ বছর চেষ্টার পর নিরাপত্তা পরিষদও সর্বসম্মত নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করতে পেরেছে।

এদিকে ৪০টি দেশের কূটনীতিকরা কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনের পর বলেছেন, রোহিঙ্গাদের অবশ্যই তাদের নিজ দেশে ফেরত নিতে হবে। তাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি সমাধান করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, চীন, ভারত, সৌদি আরবসহ ৪০টি দেশের কূটনীতিকরা কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। তাদের সঙ্গে করে নিয়ে যান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মোহাম্মদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারাও সেখানে ছিলেন।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সে দেশের নোবেল জয়ী অং সান সু চি’র দিকে তাকিয়ে থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা আসলে আরেকজনের হাতে। তিনি মিয়ানমারের সেনাপ্রধান, যার হাতে অনেক ক্ষমতা। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর রাখলে অং সান সু চি’র কর্মকাণ্ডে স্তম্ভিত হতে পারেন। রাখাইন প্রদেশে সেনাবাহিনীর অভিযানের প্রেক্ষাপটে অং সান সু চি’র ভূমিকা নিয়ে বেশ সমালোচনাও চলছে। কারণ তিনি তার সরকারের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলছেন, রাখাইনে ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী’দের বিরুদ্ধে এই সেনা অভিযান।

নিষ্ঠুর মানবাধিকার রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও মিন অং হেইংকে কার্যত সাদরেই গ্রহণ করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূলাভিযান চালানোর আগে যেই হিসাব কষেছেন মিন অং হেইং, তার পেছনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এ লজ্জাজনক আচরণও নিশ্চয়ই ভূমিকা রেখেছে। এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, তার এ হিসাব ঠিকই ছিল। তবে মিন অং হেইংকে চাপ দেয়ার মাধ্যমেই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলমান জাতিগত নির্মূল অভিযান বন্ধ করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

সর্বশেষ