শিরোনাম

সেই সিন্ডিকেটের পছন্দেই মমেক হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ পদে, কলেজের যন্ত্রপাতি কেনায় দুর্নীতির মচ্ছপ

সর্বশেষ আপডেটঃ ০৪:০৪:১৮ পূর্বাহ্ণ - ২৩ মে ২০১৮ | ২৫৭

নিজস্ব প্রতিবেদক : গরিব রোগীদের ওষুধ কালোবাজারে বিক্রি, রোগীদের নিম্ম মানের খাবার, দালাল বা ওষুধ প্রতিনিধিদের সিন্ডিকেট। এসব ভারী ‘বোঝা’ নিয়েই দিনের পর দিন চলছিল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতাল। কিন্তু একজন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন আহমেদ মাত্র আড়াই বছরেই ভেঙে দিলেন সব সিন্ডিকেট।

সমস্যা চিহ্নিত করে অ্যাকশনে গেলেন। বদলী করা হলো কয়েক চিকিৎসক। ময়মনসিংহ ছাড়া করা হলো বহু অপকর্মের হোতা ও চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ দুই কর্মচারীকে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত এসব অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করে পরিচালক যখন মাথা তুলে দাঁড়াতে শেখাচ্ছেন হাসপাতালকে ঠিক তখনই আবারো সেইসব সিন্ডিকেট মাথাচাড়া দিয়ে আবারো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে যেতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে এ হাসপাতালকে।

হাসপাতালের পরিচালকের পক্ষে অবস্থান নেয়া প্রায় তিন শতাধিক চিকিৎসককে ‘সাইজ’ করতে এবার ‘বদলী বার্তা’ নিয়ে নতুন অবয়বে আত্বপ্রকাশ করেছে সুবিধা লোভী সেই সিন্ডিকেট। ক্ষমতাধর এ সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন খোদ কেন্দ্রীয় এক স্বাচিপ নেতা ও তার ‘আদুরে’ ছোট ভাই স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা।

রোগী দরদী’ পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন আহমেদকে বেকায়দায় ফেলতেই এ হাসপাতাল ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের দায়িত্বশীল পদে আনা হচ্ছে নিজেদের পছন্দমতো চিকিৎসক। হাসপাতালের চলমান উন্নয়ন কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ‘ছক’ বাস্তবায়নে এই গুটিকয়েক চিকিৎসকই নানা স্টাইলে খিস্তিখেউর করে বেড়াচ্ছে।

এসব বিষয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে ষড়যন্ত্র নতুন কিছু নয়। সুবিধা বঞ্চিত চক্র দীর্ঘদিন যাবতই হাসপাতালকে অস্থির করে তোলার ষড়যন্ত্র করছে। তাদের শেল্টার দিচ্ছেন কেন্দ্রীয় এক চিকিৎসক নেতা, তার ছোট ভাই ও গুটিকয়েক চিকিৎসক। আমি বিশ্বাস করি ময়মনসিংহবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে যে কোন চক্রের সব ষড়যন্ত্র রুখে দিবে।’

সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ফিরে এসেছেন মেডিসিন বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক হরিমোহন পন্ডিত নিউটন। প্রায় আড়ই বছর আগেও তিনি একই পদে ছিলেন। পর পর দুই বার তিনি কীভাবে একই জায়গায় ফিরে এলেন এ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন ওঠেছে।

নিয়ম অনুযায়ী এ হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের আবাসিক সার্জন (আরএস) পদে পঞ্চম গ্রেডের চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু সিন্ডিকেটের আশীর্বাদ নিয়ে এডহক ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত সিক্স গ্রেডের জাকির ঠিকই ‘ইন’ হয়েছেন এ পদে। অথচ এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া অন্য চিকিৎসকদের পঞ্চম গ্রেড পাওয়ার কোন দৃষ্টান্ত নেই।
দায়িত্বশীল একটি সূত্রের তথ্যমতে, হাসপাতালের মেডিসিন ও কার্ডিওলজি বিভাগে বিভিন্ন সময়ে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে হাজার হাজার টাকার পরীক্ষা পাঠিয়ে কমিশন পেতেন সিন্ডিকেটের ‘সুনজরে’ থাকা ওইসব চিকিৎসকরা। কিন্তু হাসপাতালেই সব সেবা নামমাত্র মূল্যে চালু থাকায় তাদের মাথায় হাত পড়েছে। তাদের নিজস্ব আয় কমেছে। ফলে সার্ভিস চার্জের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন রকমের খোড়া যুক্তি দেখিয়ে চলছেন তারা।

একই সূত্র জানিয়েছে, ক’দিন আগে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পেয়েছেন আবুল হোসাইন নামের একজন চিকিৎসক। তিনি স্বাচিপের ওই কেন্দ্রীয় নেতা ও তাঁর ছোট ভাই’র ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। গুরুত্বপূর্ণ এ পদে তিনি দায়িত্ব পেলেও তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে সাধারণ চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের মাঝে।

অভিযোগ ও গুঞ্জণ শুরু রয়েছে, এই ভাইস প্রিন্সিপালের বিএমডিসি’র স্বীকৃত পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রী নেই। এরপরেও তিনি কীভাবে সহযোগী অধ্যাপক ও ভাইস প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পেলেন এ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সাধারণ চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সূত্র মতে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশক্রমে অন্ত:বিভাগীয় বদলীর জন্য সপ্তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের বদলীর জন্য গঠিত ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির একজন এই ভাইস প্রিন্সিপাল। গুরুত্বপূর্ণ এ পদে তাকে স্থলাভিষিক্ত করেছেন মূলত কেন্দ্রীয় ওই চিকিৎসক নেতা ও তার ছোট ভাই।

ফলে হাসপাতালটিতে সেবার পরিবেশ ধরে রাখতে এতোদিন হাসপাতালের ‘রোগী বান্ধব’ পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিনকে আকুন্ঠ চিত্তে সমর্থন জানানো প্রায় তিন শতাধিক চিকিৎসক রয়েছেন মহাফাঁপরে। ওই চিকিৎসক নেতার ছোট ভাইকে ‘তোয়াজ’ না করা এসব চিকিৎসকরা ভেতরে ভেতরে বদলী আতঙ্কে ভুগছেন।
এ আতঙ্কের কারণও ব্যাখা করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক। তারা বলছেন, কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে আবুল হোসাইন যোগ দেয়ার পর পরই তাকে নিয়ে রীতিমতো ‘ফেসবুক শোডাউন’ করেছেন ওই কেন্দ্রীয় চিকিৎসক নেতার ছোট ভাই। একে অপরের মুখে কেক তুলে দিয়ে হাস্যোজ্জল ছবি ফেসবুকে নিজের লোকজনকে দিয়ে ছড়িয়ে দিয়ে প্রকারান্তরে সিন্ডিকেট বিরোধী চিকিৎসকদের ‘বদলী বার্তা’ দিয়েছেন। এ নিয়েও তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে।
এসব বিষয়ে কলেজটির সদ্য যোগ দেয়া ভাইস প্রিন্সিপাল ডা: আবুল হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের নতুন ভাইস প্রিন্সিপাল ডা: আবুল হোসাইন বলেন, ‘যোগ্যতা আছে বলেই আমাকে এ পদে পদায়ন করা হয়েছে। আমি কারো বন্ধু হতেই পারি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় আমার ওই বন্ধু আমাকে এ পদে বসিয়ে দিয়ে গেছেন। নিয়মের বাইরে কাউকে এসব পদে পদায়নের সুযোগ নেই। সব যোগ্যতা পূরণ করে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করে আমি এ পদে এসেছি।’

কলেজের যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ
অভিযোগ ওঠেছে, ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই ২০১৬-১৭ বছরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ৯ কোটি টাকার ভারী যন্ত্রপাতি কিনতে সীমাহীন দুর্নীতি হয়েছে। আরডেন্ট সিস্টেম নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ওই দরপত্রের কার্যাদেশ পাইয়ে দিতে নাম-গোত্রহীন দৈনিকে বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে। অতি উচ্চমূল্যে তাদের কাজ দেয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে আকাশ পাতাল পার্থক্য দেখানো হয়েছে কেনা যন্ত্রপাতির বাস্তব ও সরবরাহকৃত দামের মধ্যে। আর এসব করে চেনা সেই সিন্ডিকেটের হর্তাকর্তা থেকে শুরু করে সদস্যরা নিজেদের মাঝে পার্সেন্টিজ ভাগাভাগি করেছেন বলেও কানাঘুষা চলছে হাসপাতাল ও কলেজের অন্দরে-বাইরে। কলেজের শিক্ষা উপকরণ ও স্টেশনারী কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যাসত্য যাচাই-বাছাই করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্তেরও দাবি তুলেছেন অনেকেই।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের (মমেক) প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা: মো: আনোয়ার হোসেন বলেন, দুর্নীতির খবরটির নুন্যতম কোন ভিত্তি নেই। এটি মূলত মহল বিশেষের একটি অপপ্রচার। সরকারি বিধি মোতাবেকই ওই প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেয়েছে। উচ্চমূল্যে যন্ত্রপাতি কেনার খবরটিও ভূয়া।

 

সর্বশেষ