শিরোনাম

জিয়াই ছিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল হোতা

সর্বশেষ আপডেটঃ ০৫:৩৬:০২ অপরাহ্ণ - ১৭ আগস্ট ২০১৮ | ২৬৬

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেছেন, তার দুঃখ রয়ে গেল তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার অপরাধে জিয়ার বিচার করতে পারলেন না। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, এমনকি যারা এ মামলার বিবরণী অনুসরণ করেছেন তারা এক বাক্যেই বলতে পারবেন যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য কষ্টি পাথরে প্রমাণিত সত্য।

পূর্বে আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হকও বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে অত্যন্ত মূল্যবান মন্তব্য করেছেন। তার মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ এজন্য যে, তিনি আইনমন্ত্রী, তার পিতা সিনিয়র এ্যাডভোকেট প্রয়াত সিরাজুল হক সাহেবের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার জন্য গঠিত প্রসিকিউশন দলের অন্যতম এবং গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এ্যাডভোকেট আনিসুল হক।

এ্যাডভোকেট সিরাজুল হকের নেতৃত্বে এই দল বিচারিক আদালত থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত মামলাটি পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে সিরাজুল হক সাহেবের প্রয়াণের পর আপীল বিভাগে মামলাটি পরিচালনা করেন এ্যাডভোকেট আনিসুল হক। সুতরাং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তার জ্ঞান নির্ভুল। এ মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দী থেকে কি কি কথা এসেছে, জবানবন্দীর বাইরেই বা কি জানা গেছে, তার সবকিছুই এ্যাডভোকেট আনিসুল হকের নখদর্পণে।

মামলাটি যখন হাইকোর্টে আসে আমি তখন ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল পদে বহাল ছিলাম। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দায়িত্ব প্রদান করায় আমারও সুযোগ হয়েছিল প্রসিকিউশন দলের হয়ে কাজ করার। সেই সুবাদে আমি যা জেনেছি তারই আলোকে এ মামলায় সাক্ষীদের জবানী থেকে জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে যে সব কথা নির্ভুলভাবে ফুটে উঠেছে তা ব্যক্ত করা জাতির স্বার্থে প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। যাতে জনগণের সামনে ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে যায়। সে উদ্দেশ্যেই আমার এই প্রয়াস।

শুরুতেই হত্যাকারীদের দু’জন মূল পাষ- কর্নেল ফারুক এবং কর্নেল রশিদ একটি ব্রিটিশ টেলিভিশন চ্যানেলে এক সাক্ষাতকার প্রদান করে। সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন লন্ডনের উধরষু ঙনংবৎাবৎ পত্রিকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক এন্থনি মাসকারেনিহাস। দীর্ঘ এ সাক্ষাতকার কালে এ দু’জন ব্যক্ত করে যে, বঙ্গবন্ধু হত্যা পরিকল্পনাকালে তারা সে সময়ের উপ-সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের কাছে গিয়ে হত্যা পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করলে জিয়া তাদের এগিয়ে যেতে বলেন এবং তাদের উৎসাহিত করে বলেন, তারা সফল হলে জিয়া তাদের সঙ্গে থাকবেন। এ সাক্ষাতকার অনুষ্ঠানটি যুক্তরাজ্য এবং বাইরে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এ অনুষ্ঠানের ধারণকৃত ভিডিও হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়।

এ প্রসঙ্গে তিনটি কথা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে-

প্রথমত. একজন সেনা কর্মকর্তার কাছে যখন রাষ্ট্রপ্রধান হত্যার পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়, সে সেনা-কর্মকর্তার তাৎক্ষণিক দায়িত্ব হয়ে যায় পরিকল্পনাকারীদের পুলিশে সোপর্দ করা। তা না করা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল এবং জিয়াও সে কারণে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ করেছেন।

দ্বিতীয়ত. জিয়া তাদের উৎসাহিত করে দ্বিতীয় দফা রাষ্ট্রদ্রোহ করেছেন এবং খুনীদের সারিতে স্থান করে নিয়েছেন। আমাদের ফৌজদারি দ-বিধি আইনে যে ব্যক্তি অপরাধ করার জন্য অন্যকে উৎসাহিত করে সেও একই অপরাধে অপরাধী এবং তার সাজাও সমান।

তৃতীয়ত. জিয়া সেদিন তাদের উৎসাহিত না করে যদি তাদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতেন তাহলে বঙ্গবন্ধু খুন হতেন না। সোজা কথায় জিয়াই ছিলেন তাদের প্রেরণার উৎস, তথা প্রাণশক্তি এবং সে অর্থে হত্যা পরিকল্পনার মূল নায়ক হিসেবে জিয়াকে চিহ্নিত করাই আইনের কথা।

এ মামলায় যারা সাক্ষী দিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সে সময়ের সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ। তার জবানবন্দী থেকেও জিয়ার মুখ্য ভূমিকাটি প্রচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে। জেনারেল শফিউল্লাহ রাষ্ট্রপক্ষের ৪৫ নং সাক্ষী হিসেবে বলেন, ‘আমি যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলি, তিনি আমার গলার আওয়াজ শুনে বলে উঠলেন, ‘শফিউল্লাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি এটাক করেছে, কামালকে বোধহয় মেরে ফেলেছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।’ উত্তরে আমি বলেছিলাম, ও am doing something. Can you get out of the house? আমি যখন জিয়া ও খালেদ মোশারফকে ফোন করি তখন তাদেরকে তাড়াতাড়ি আমার বাসায় আসার কথা বলি, ১৫/২০ মিনিটের মধ্যে তাহারা আমার বাসায় আসিয়া পড়ে। জিয়া ইউনিফরম এবং সেভ, খালেদ মোশারফ নাইট ড্রেসে নিজের গাড়িতে আসে। ওইখানে আমি দু’জনকেই ইতোমধ্যে আমার জানা পরিস্থিতি জানাইলাম এবং খালেদ মোশারফকে ৪৬ ব্রিগেডে তাড়াতাড়ি যাইয়া সাফায়াত জামিলকে সাহায্য করার জন্য নির্দেশ দেই। কারণ, তখনও পর্যন্ত আমার পূর্বের দেয়া নির্দেশের কোন তৎপরতা দেখিতে পাইতে ছিলাম না। এক পর্যায়ে আমার ডেপুটি চীফ আমাকে বললেন, Dont send him, (খালেদ মোশারফ) he is going to spoil it. জে. শফিউল্লাহ আরও বলেন, ‘এক পর্যায়ে ডেপুটি চীফ জেনারেল জিয়া বলিলেন, সিজিএস খালেদ মোশাররফকে আর বাহিরে যাইতে দিও না।’

তার জবানবন্দীর পরবর্তী এক পর্যায়ে জেনারেল শফিউল্লাহ বলেন, ‘এই সমস্ত অনুষ্ঠান শেষে আমি বাসার দিকে রওয়ানা দিব, এমন সময় তাহেরউদ্দিন ঠাকুর বলেন, কনফারে›স হইবে। এখন যাইবেন না। এরপর ১৮ তারিখ সকাল পর্যন্ত একই ব্যাপারে বঙ্গভবনে থাকিতে বাধ্য হই। এই কয়দিন ডেপুটি চীফ জিয়া, শাহ মোয়াজ্জেম, ওবায়দুর রহমানকে বঙ্গভবনে আসা-যাওয়া করতে দেখিয়াছি।

জেনারেল শফিউল্লাহ আরও বলেন, ‘কনফারে›স শুরু হওয়ার আগে আমার এডিসি জানায় যে, ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল সাফায়াত জামিল আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। আমি অনুমতি দিলে সাফায়াত তাহার ব্রিগেড মেজর হাফিজকে নিয়া আমার রুমে ঢুকে এবং বসতে বসতে বলে, sir dont trust your deputy, he is behind all these things.

রাষ্ট্রপক্ষের ৪৪ নং সাক্ষী হিসেবে কর্নেল সাফায়াত জামিল যা বলেছেন, জেনারেল শফিউল্লাহর জবানীর সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখলে জিয়ার সম্পৃক্ততার বিষয় কৃষ্টাল পাথরের মতোই স্পষ্ট হয়ে যায় বলে নিম্ন কর্নেল জামিলের ভাষ্য লিপিবদ্ধ করছি।

কর্নেল জামিল বলেন, ‘আমি দ্রুত ইউনিফর্ম পরিয়া মেজর হাফিজসহ ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারের দিকে রওয়ানা দেই। পথিমধ্যে জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসায় যাই এবং তাহাকে শেভরত অবস্থায় পাই। আমার নিকট হইতে ঘটনা শোনার পরে তিনি (জিয়া) বলিলেন, So what? President is killed, vice-president is there, uphold the constitution

কর্নেল জামিল আরও বলেন. ‘সকাল অনুমান ৮টার সময় চাকরিচ্যুত মেজর ডালিম ইউনিফর্ম ও সশস্ত্র অবস্থায় একটি জিপে হেভি মেশিনগান ফিট করিয়া কয়েকজন সশস্ত্র সেনাসহ মেজর জেনারেল শফিউল্লাকে ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসে নিয়া আসে। তাহাদের পিছনে পিছনে ডেপুটি আর্মি চীফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানসহ আরও কয়েকজন সেনা হেডকোয়ার্টারের অফিসে আসেন।’

সাক্ষ্যেও পরবর্তী পর্যায়ে কর্নেল জামিল আরও বলেন, ‘জিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করিয়া ১৫ আগস্ট ও ৩ নবে¤¦রের হত্যাকান্ডে জড়িত অফিসারদের বৈদেশিক মিশনগুলোতে চাকরি দিয়া পুনর্বাসন করেন।’ এরপর তিনি বলেন, ‘মেজর ফারুক সাভার এবং বগুড়াতে মিউটিনি (অভ্যুত্থান) ঘটাইবার চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হয়, মেজর রশিদ টু-ফিল্ড রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব গ্রহণের চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হয়। জেনারেল জিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করিয়া আবার তাহাদের বিদেশে পাঠাইয়া দেয়। ’

এ পর্যায়ে লে. কর্নেল মোঃ আবদুল হামিদের জবানবন্দী উপস্থাপন করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষের ৯নং সাক্ষী হিসাবে লে. কর্নেল হামিদ বলেন, ‘আমরা সিনিয়ার অফিসাররা ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট টেনিস কোর্টে নিয়মিত টেনিস খেলতাম। ১৪ আগস্টে বিকাল বেলা জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল মামুন, কর্নেল খোরশেদ এবং আমি টেনিস খেলতে ছিলাম। তখন আমি লক্ষ্য করলাম চাকরিচ্যুত মেজর ডালিম এবং মেজর নূর টেনিস কোর্টের আশপাশে ঘোরাফেরা করিতেছে। প্রকৃতপক্ষে এদের দু’জনকে ওই আগস্টের প্রথম হইতে এইরূপভাবে পাই। ইহা আমাদের কাছে অস্বাভাবিক বলিয়া মনে হয়, কারণ তাহারা ছিল চাকরিচ্যুত জুনিয়র অফিসার। একদিন জেনারেল শফিউল্লাহ আমাকে বলিলেন, এরা চাকরিচ্যুত জুনিয়র অফিসার, এরা কেন এখানে টেনিস খেলিতে আসে? এদেরকে মানা করিয়া দিবেন- এখানে যেন না আসে। খেলা শেষে আমি মেজর নূরকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তোমরা কার অনুমতি নিয়া এখানে খেলিতে আস? জবাবে জানালেন, আমরা জেনারেল জিয়ার অনুমতিতে খেলিতে আসি।’

জেনারেল শফিউল্লাহ, কর্নেল সাফারাত জামিল এবং কর্নেল হামিদের জবানবন্দী সাক্ষ্য আইনের আলোকে বিশ্লেষণ করলে কোন আদালতের পক্ষেই জিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করা ছাড়া কোন বিকল্প থাকবে না, একথা ফৌজদারি আইনে মোটামুটি ধারণা আছে এমন সকল আইনজীবীই বলবেন। সাক্ষ্য আইনে একটি তত্ত্ব রয়েছে যাকে বলা হয় সার্কাম্্সট্যানশিয়াল এভিডে›স বা পরিস্থিতিগত সাক্ষ্য। একথাও বলা হয়, একজন চাক্ষুস সাক্ষী মিথ্যা বলতে পারে কিন্তু পরিস্থিতি মিথ্যা বলতে পারে না। কয়েকটি ঘটনা যদি একটি অভগ্ন চেইন তৈরি করতে সক্ষম হয়, তাহলে সার্কাম্্সট্যানশিয়াল এভিডে›স চাক্ষুস সাক্ষীর চেয়েও অধিক বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে।

এই তিনজন সাক্ষীর মধ্যে জেনারেল শফিউল্লাহর সাক্ষ্য অত্যন্ত জোরালোভাবে এ ধরনের সার্কামনস্টেনশিয়াল সাক্ষ্যের সৃষ্টি করেছে। জেনারেল শফিউল্লাহ যে সময় জিয়া এবং খালেদ মোশারফ সাহেবকে অতি প্রত্যুষে ফোন করে আসতে বলেন তখন তাদের ঘুমিয়ে থাকারই কথা অথবা সবে মাত্র গাত্রোত্থান করার কথা। জেনারেল শফিউল্লাহ যখন কর্নেল সাফায়েত জামিলকে ফোন করেন তখন তার (জেনারেল শফিউল্লাহর) মনে হয়েছিল তিনি কর্নেল জামিলকে ঘুম থেকে তুলেছেন। জেনারেল শফিউল্লাহর ডাকে খালেদ মোশারফ সাহেবও এসেছিলেন নাইট ড্রেসে। অথচ জিয়া এসেছিলেন ইউনিফরম পরিহিত দাড়ি কামানো অবস্থায়, এর থেকে যে কোন যুক্তিসঙ্গত ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য যে জিয়াউর রহমান সব জানতেন বলেই ভোরে কাক ডাকার আগেই ফিটফাট হয়ে অপেক্ষারত ছিলেন। আইনের ভাষায় বলতে গেলে এটা ছাড়া অন্য কোন যুঢ়ড়ঃযবংরং গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটাও তাৎপর্যপূর্ণ যে বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পূর্বে দুই খুনী, যথা : ডালিম এবং নূর টেনিস কোর্টের পাশে ঘুর ঘুর করছিল, সেখানে জিয়াও টেনিস খেলছিলেন।

খালেদ মোশারফকে কোন অপারেশনে না পাঠানো এবং বাইরে না যেতে দেয়ার দাবিও circumstantial সাক্ষ্যের চেইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, কেননা খালেদ মোশারফ অপারেশন গেলে বা বাইরে গেলে হত্যাকারীদের পরাস্ত এবং শায়েস্তা করতে পারবেন, জিয়া এই ভয় থেকেই খালেদ মোশারফকে নিষ্ক্রিয় রাখতে চেয়েছিলেন। জিয়াকে বিশ্বাস না করার দাবি জানিয়ে কর্নেল জামিল, জেনারেল শফিউল্লাহকে যা বলেছেন তাও circumstantial সাক্ষ্যের শিকলে একটি অনস্বীকার্য প্রতিস্থাপন। কর্নেল জামিল ছিলেন ৪৬ ব্রিগেডের প্রধান, সেই মর্যাদায় তিনি অনেক কিছুই জানবেন, এটাই স্বাভাবিক। তদুপরি জিয়া যখন তাকে বললেন, So what? President is killed but the vice-president is there, তখন জিয়ার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে কর্নেল জামিলের সন্দেহের কোন অবকাশ থাকার কথা নয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জিয়ার দুঃখ-বেদনা এনং খুনীদের ওপর ঘৃণা প্রকাশেরই কথা এই কারণে যা তারা জাতির জনককে হত্যা করেছে। তা না করে বরং জিয়া বললেন, ঝড় যিধঃ? জাতির পিতাকে খুন করা হলো, অথচ জিয়া বললেন কি-না, ‘তাতে কি হয়েছে’? তদুপরি জিয়া মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন। মোশতাক উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন না। আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল জিয়া কর্তৃক খুনীদের বৈদেশিক দূতাবাসে পদায়ন করে পুরস্কৃত করার এবং পরবর্তীতে তাদের খুনের দায় থেকে বাঁচানোর জন্য ইনডেমনিটি আইন প্রণয়ন করার ঘটনা। বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার ভূমিকা না থাকলে তিনি কেন খুনীদের পুরস্কৃত করতে গেলেন এবং কেনই বা খুনের দায় থেকে বাঁচাতে চাইলেন?

Circumstantial সাক্ষ্য হিসেবে এ ঘটনা দুটো কোন বিচারকের দৃষ্টি এড়াতে পারে না। তদুপরি সাক্ষ্য আইনের ৮ ধারায়ও এ ঘটনা দুটো বিবেচনা যোগ্য। লে. কর্নেল হামিদের টেনিস খেলা সম্পর্কীয় জবানবন্দীও circumstantial সাক্ষ্যকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। এটা সবারই জানা যে, সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলার বিধিবিধান কঠোরভাবে মেনে চলতে হয়। যেখানে টেনিস কোর্টটি ছিল উর্ধতন কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত সেখানে জিয়াউর রহামন কর্তৃক আগস্ট মাসব্যাপী এবং বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু হত্যার কয়েক ঘণ্টা পূর্বে চাকরিচ্যুত নিম্ন মর্যাদার কর্মকর্তাদের উর্র্ধতন কর্মকর্তাদের টেনিস কোর্টে ঘোরাফেরা করতে দেয়ার ঘটনা যে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ তা নিশ্চয়ই কোন যৌক্তিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষই অস্বীকার করতে পারবেন না। প্রশ্ন হলো, কেন তারা টেনিস কোর্টের চারপাশে ঘোরাফেরা করত যেখানে জিয়াও খেলতেন এবং কেনই বা জিয়া এই দু’জন নিম্ন মর্যাদার অফিসারকে সেখানে প্রতিনিয়ত যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। এর একমাত্র গ্রহণযোগ্য জবাব হতে পারে এই যে, গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে জিয়ার পক্ষে এই দু’জন খুনীর সঙ্গে টেনিস কোর্টের আশপাশে খেলার ছলে কথা বলা সহজ ছিল।

কর্নেল জামিলের সাক্ষ্যে প্রকাশ পাওয়া আরও একটি তথ্য সাক্ষ্যের মানদন্ডে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অন্যান্য ব্রিগেডের ন্যায় ৪৬ ব্রিগেডের ফিল্ড ইনটেলিজে›স ছিল। কিন্তু ১৫ আগস্টের ঘটনার আগে এই ফিল্ড ইনটেলিজে›সকে ৪৬ ব্রিগেড অর্থাৎ কর্নেল জামিলের নিয়ন্ত্রণ থেকে তুলে নেয়া হয়।’

কর্নেল জামিল যদিও বলেননি এই কাজটি কে করেছিল, তবুও এটি নিশ্চয়ই যে তার উর্ধতন কোন কর্মকর্তাই এটি করেছিলেন। তার সরাসরি উর্ধতন ছিলেন ডেপুটি চীফ অব স্টাফ জিয়াউর রহমান। তার ওপরে ছিলেন জেনারেল শফিউল্লাহ। সকল পারিপার্শ্বিক অবস্থার আলোকে এটা ভাবা যায় না যে, জে. শফিউল্লাহ এটা করেছেন। তাছাড়া সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী উপপ্রধানই এ ধরনের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সে অর্থে এটা ধরে নেয়া খুবই স্বাভাবিক যে কর্নেল জামিল যেন ষড়যন্ত্রের তথ্য জানতে না পারেন সে কারণেই জিয়া ৪৬ ব্রিগেড থেকে ফিল্ড ইন্টেলিজে›স ইউনিট সরিয়ে নিয়ে ছিলেন ১৫ আগস্ট হত্যাকা-ের পূর্বে।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ জিয়াউর রহমানের একান্ত ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। তিনি জিয়ার মন্ত্রীও ছিলেন। তিনিও তার লেখা বইয়ে প্রচ্ছন্নভাবেই বলেছেন যে, বঙ্গবন্ধু খুনীদের সঙ্গে জিয়া নিবিড় সংযোগ চালিয়ে যেতেন বলে ধারণা করা যায়। তার উক্ত বইয়ের ৩৩ পৃষ্ঠায় মওদুদ সাহেব লিখেছেন, It seems that Zia also maintained close link with officers that killed Mujib.

এত প্রাণবন্ত সাক্ষ্য নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করার পর যুক্তির কাছে দায়বদ্ধ কোন মানুষই বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার মুখ্য ভূমিকার কথা অস্বীকার করতে পারবেন না। ফারুক-রশিদের কথা শোনার পর তাদের গ্রেফতার করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বঙ্গবন্ধু খুন হতেন না।

ফৌজদারি আইনে motive বলে একটি তত্ত্ব¡ আছে। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করে জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত অর্জন এবং সমস্ত চেতনা ধ্বংস করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। প্রথমেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বজনের মনে গাঁথা জয়বাংলা স্লোগান দ্বীপান্তরে পাঠিয়ে দেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের এবং পাকিস্তানী সেনাদের আত্মসমর্পণের স্থান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে শিশু পার্কে রূপান্তরিত করেন এবং শাহ আজিজসহ কুখ্যাততম রাজাকারদের মন্ত্রিসভায় স্থান দেন এবং সংবাদ মাধ্যমে বলেন, মুসলমান সৈন্যদের আত্মসমর্পণের স্মৃতি জিয়িয়ে রাখা উচিত নয় বলেই তিনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অবয়ব পরিবর্তন করেছেন।

তার এসব কর্মকান্ড এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা কখনও মন থেকে মেনে নিতে পারেননি বলেই বঙ্গবন্ধুর ওপর ছিল তার বিদ্বেষ যার কারণেই তিনি পাকিস্তানী গোয়েন্দাদের প্ররোচনায় এবং প্রত্যক্ষ সহায়তায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে তার শিশু সন্তানসহ সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার।

জিয়া মরে গিয়ে বেঁচে গেছেন এটাই অকাট্য সত্য। বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধুর বেশিরভাগ খুনীর যা হয়েছে, জিয়ারও তাই হতো অর্থাৎ ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হতো, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, জিয়া মরে গিয়ে বিচারের এবং সাজার দায় থেকে বেঁচে গেছে। সর্বশেষে আমি মনে করি বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে অন্যান্য যারা জড়িত ছিল তাদের সবাইকে চিহ্নিত করার জন্য একটি কমিশন গঠন করা উচিত, যে কথাটি আমি হাইকোর্টে থাকাকালে একটি রায়েও বলেছিলাম।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, আপীল বিভাগ

সৌজন্যেঃ দৈনিক জনকণ্ঠ

সর্বশেষ
জনপ্রিয় খবর