শিরোনাম

উন্নয়নের লক্ষ্যে জাপান-বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব

সর্বশেষ আপডেটঃ ০৩:২৪:২৫ পূর্বাহ্ণ - ২৯ মে ২০১৯ | ৬৫

১২ দিনের বিদেশ সফরের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (২৮ মে) জাপান পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাপান ছাড়াও তিনি সৌদি আরব, ফিনল্যান্ড ও ভারত সফর করবেন।

জাপান সফরকালে সেদেশের বিখ্যাত দৈনিক দি জাপান টাইমস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। পাঠকদের জন্য লেখাটি ভাষান্তর করা হলো। ভাষান্তর করেছেন এরশাদুল আলম প্রিন্স।

গত এক দশকে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন বিশ্ববাসীর কাছে এক বিস্ময়। এ অর্জনের পেছনে মূল কারণ, আমাদের গণমুখী উন্নয়ন নীতি। যার মূল চেতনা হচ্ছে জনগণের অংশীদারিত্ব। গত এক দশকে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৫ শতাংশ এবং এ বছর আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ৮.১৩ শতাংশ। শিগগিরই আমরা দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারব বলে আশাবাদী।

ভিশন ২০২১ এর সাফল্যের পর আমরা আজ ২০৪১ নাগাদ একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার প্রত্যাশা করি। বৈশ্বিক চাহিদা ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মানব সম্পদে রূপান্তরই এ লক্ষ্য অর্জনের মূল শক্তি।

জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনমান নিশ্চিতের লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নমূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। আমরা জাপানের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ একশ’টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি।

পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার মেলবন্ধনে বাংলাদেশ ও জাপান এক নিবিড় বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে আবিষ্ট। জাপানের শিক্ষার্থীরা তাদের টিফিনের টাকা থেকে টাকা বাঁচিয়ে আমাদের মহান মুক্তি সংগ্রামে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদাতা প্রথম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জাপান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। আমাদের পতাকায়ও রয়েছে এক দারুণ সাদৃশ্য। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলতেন, “জাপানের পতাকা আমাকে উদীয়মান সূর্যের দেশের কথা মনে করিয়ে দেয় এবং আমাদের পতাকা লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা ও সবুজ মাতৃভূমির কথাই মনে করিয়ে দেয়।”

কৃষি খামার আধুনিকায়নের মাধ্যমে কৃষি থেকে শিল্পায়নে জাপানের উত্তরণকে অনুসরণ করার জন্য তিনি আমাদের অনুপ্রাণিত করতেন। ১৯৭৩ সালের অক্টোবরে জাপানে বঙ্গবন্ধুর আগমনের মধ্য দিয়ে আমাদের সম্পর্কের শক্ত ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতির অনুরোধে জাপান ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু সেতুর জন্য একটি সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করে। বঙ্গবন্ধুর রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রথম জাপানি ভাষাতেই অনূদিত হয়।

আমি যখন বিরোধীদলের নেত্রী ছিলাম তখন ১৯৯২ সালে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে জাপান সফর করি। সেই সফরের মাধ্যমে জাপানের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক হয়। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম সফরের সময় জাপান পদ্মা ও রূপসা সেতু তৈরির জন্য আমাদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়। জাপান আমাদের রূপসা সেতু তৈরি করে ও পদ্মা সেতুর সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করে। দুই দেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে তখন ‘সংসদীয়’ ও ‘বন্ধুত্ব’ কমিটিও গঠন করা হয়।

১৯৭২ সাল থেকে আমরা জাপানের কাছ থেকে ১১.৩ বিলিয়ন সরকারি সাহায্য পেয়েছি। ১৯৭২ সাল থেকে জাপান আমাদের সবচেয়ে বড় বৈদিশিক সাহায্যদাতা বন্ধু। কর্ণফুলী সার কোম্পানি, প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল এবং গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি শহরে পানি সরবরাহসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাপানের অনুদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি জাপানে অবস্থানরত আমাদের প্রবাসী বাঙালিরাও জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।

আমরা বাংলাদেশে জাপানি উদ্যোক্তাদের উত্তরোত্তর বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ব্যাপারে আশাবাদী। বর্তমানে বাংলাদেশে ২৮০ জাপানি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে যা গত এক দশকে ১০ গুণ বেড়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন জাপানি প্রতিষ্ঠানের সম্পাদিত সমীক্ষা থেকে এটা স্পষ্ট যে, জাপানি বা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজের মান ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘জাপান-বাংলাদেশ পাবলিক-প্রাইভেট অর্থনৈতিক সংলাপ’ -এর সূচনা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এর ফলে বিভিন্ন সেক্টরে ছয়টি প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে।

জাপান সরকার নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় একটি জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কাজ করে যাচ্ছে। মহেশখালী-মাতারবাড়ী উন্নয়ন প্রকল্পেও রয়েছে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব।

বাংলাদেশে মধ্যম আয়ের একটি দেশে হিসেবে পরিণত হচ্ছে। যা বাংলাদেশে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ করতে আরও উৎসাহিত করছে।

বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হচ্ছে বিনিয়োগ বান্ধব বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধি। সেই উপলব্ধি থেকেই আমরা ২০১৮ সালে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইন’ নামে একটি আইন প্রণয়ন করেছি। যাতে করে বিনিয়োগকারীরা এক জায়গা থেকেই বিভিন্ন সুবিধা ও সেবা পেতে পারেন। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশই সর্বাধিক উদার বিনিয়োগ বান্ধব নীতি অনুসরণ করে থাকে।

আমরা প্রায় সব বেসরকারি সেক্টরেই যেকোনো পরিমাণ অর্থের বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আমাদের উদার ট্যাক্স ও করনীতির সুবিধা নিয়ে বাণিজ্য করতে পারেন। ৩২টি দেশের সঙ্গে আমাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি আছে এবং জাপানসহ ২৮টি দেশের সঙ্গে রয়েছে দ্বৈত কর মওকুফ চুক্তি।

দীর্ঘ-মেয়াদি পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিতের লক্ষ্যে আমরা ‘ডেল্টা প্লান ২১০০’ প্রণয়ন করেছি। ‘এজেন্ডা ২০৩০’, ‘ভিশন ২০৪১’ ও ‘ভিশন ২০৭১’ আমাদের সে লক্ষ্য অর্জনের একেকটি মাইলফলক। আমরা কৃষি অর্থনীতি থেকে সেবা ও উৎপাদনমুখীতার দিকে অগ্রসর হচ্ছি।

পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, হাই-টেক পার্ক ও আইসিটি পার্কের কাজ এখন দৃশ্যমান। বহুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমরা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হাতে নিয়েছি। যার মাধ্যমে এ অঞ্চলে আঞ্চলিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আমাদের জীবন জীবিকার মানও উন্নত হবে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু জাপান ও এর জনগণ আমাদের এই পরিবর্তনকামী উন্নয়নের পথে সঙ্গী হবেন।

২০১৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় সন্ত্রাসী হামলায় ছয়জন জাপানি নাগরিক নিহত হন। সেই বেদনাহত ও শোকাবহ দিনগুলোতে জাপানের জনগণ আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। জাপান ও বাংলাদেশ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বদ্ধ পরিকর।

২০২২ সালে আমরা আমাদের বন্ধুত্বের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে যাচ্ছি। শান্তি ও ‍উন্নয়নে আমাদের যৌথ অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আমরা আমাদের জনগণের সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারব বলেই আমি বিশ্বাস করি। দুই দেশের পতাকা সেই ঐক্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

শৈশব থেকেই জাপান আমাকে আকর্ষণ করে। জাপানি ছবি, ক্যালেন্ডার, ডাকটিকিট ও পুতুল আমি সংগ্রহ করতাম। জাপান আমার হৃদয়ের খুব কাছাকাছি। আমার বাবার কাছ থেকেই আমি এটি পেয়েছি। আমি আমার দেশ আরেকটি জাপান হবে এমনটাই প্রত্যাশা করি। আজ একটি নতুন প্রত্যাশা ও ঐকতান নিয়ে জাপানে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। এই নতুন যুগ আমাদের আরও কাছে নিয়ে আসুক, আমাদের আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত করুক, আগামী দিনের জন্য একটি নিরাপদ বিশ্ব নির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করুক; এটাই প্রত্যাশা।

দি জাপান টাইমস -এ প্রকাশিত

ভাষান্তর: এর‌শাদুল আলম প্রিন্স

সর্বশেষ