শিরোনাম

অপূর্ণতায় মানুষের মেরুদন্ডটা নুয়ে পড়ে, ভেঙে যায় না

সর্বশেষ আপডেটঃ ০২:২৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ - ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ২০

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

মানুষের অপূর্ণতা কখনো পূর্ণতা পায় না। সে অপূর্ণতার জায়গাটাতে একটা গভীর শুন্যতা নিঃশব্দে কাজ করে যেটা হয়তো চোখে দেখা যায় না। বোঝা যায় না তারপরও অদৃশ্য মনের ছাপ অচেনা ঠিকানায় দাগ কেটে যায়। যেখানে মানুষ নিজেকে খুঁজে কিন্তু কি খুঁজে তা সে নিজেও জানতে পারেনা।

এমন একটা দোদুল্যমান বাস্তবতায় কোথায় যেন একটা না পাবার আকুতি মানুষকে সব সময় তাড়িয়ে বেড়ায়। সেটা ছোট-বড় সব ধরণের মানুষের ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। সেটা স্বপ্ন নাকি স্বপ্নের চেয়ে অনেক বড় একটা অচেনা শক্তি তা হয়তো আমৃত্যু মানুষ বুঝে উঠতে পারেনা।

একজন বড় চিত্রশিল্পীর কথা মনে পড়ে গেলো। পাবলো পিকাসো। তাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল- আপনার আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে আপনার সবচেয়ে প্রিয় ছবি কোনটি ? প্রশ্নটা সাধাসিধা মনে হলেও এর গভীরতার শেকড় মাটির কতটা ভিতরে ছিল তা জানাটা অনেক কঠিন। প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “প্রতিটি ছবি আঁকার সময়ই মনে হয়েছিল এরপরে যে ছবিটি আঁকবো সেটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় ছবি । ”

এ কথার প্রতিধ্বনি জীবনের শেষ পর্যন্ত থেকে যায় কিন্তু পরের প্রিয় ছবিটা আর আঁকা হয়না।

সৃষ্টির অপুর্ণতাটা এভাবেই থেকে যায়। আব্রাহাম মাসলোর মোটিভেশন থিওরিতে “নিড ফর সেলফ একচুয়ালাইজেশন” নামে মানুষের একটা চাহিদার কথা উল্লেখ করেছেন। পিকাসোর কথাটার সাথে এর সাদৃশ্য চোখে পড়ার মতো। যেমন- পৃথিবীর বিখ্যাত কবিকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় আপনি কি আপনার শ্রেষ্ঠ কবিতাটি লিখতে পেরেছেন। তবে সে বলবে না অনেক কবিতা লিখলেও আমার বিখ্যাত কবিতাটা এখনও লেখা হয়নি।

একজন বিশ্বসেরা অভিনেতাকে যদি কেউ প্রশ্ন করে আপনি কি আপনার শ্রেষ্ঠ চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন। এখানেও উত্তর আসবে নাহ, অনেক অভিনয়তো করলাম শ্রেষ্ঠ চরিত্রে অভিনয় তো এখনো করা হলো না | মানুষ যতই বড় হোক, যত বড় তার অর্জন হোক, সবখানেই একটা অপূর্ণতা থেকে যায়। এই অপুর্ণতাটা মানুষকে টানতে টানতে মৃত্যু পর্যন্ত এগিয়ে নেয়।

পাবলো পিকাসোর একটা কথা দেখে ‘থ’ বনে গেলাম | তিনি লিখেছেন- “ভালো শিল্পীরা অনুকরণ করে, মহান শিল্পীরা করে চুরি। ” কিভাবে এমন একটা দর্শনকে বিশ্লেষণ করবো তা নিয়ে অনেকটা বিপদে পড়ে গেলাম। তবে সাহস পেলাম ১৮৯০ এর দশকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ মহাভারত থেকে কাহিনী নিয়ে নিজের কল্পনা ও ভাবনা মিশিয়ে যে কাব্যনাট্য রচনা করেছিলেন তা থেকে। এই কাব্যনাট্যগুলো হলো ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘বিদায় অভিশাপ’, ‘গান্ধারীর আবেদন’, ‘নরকবাস’ এবং ‘কর্ণকুন্তী সংবাদ’। ছোট ছোট এই কাহিনীগুলোকে বিশ্ব কবি নিজের মতো করে সম্প্রসারণ করেছেন। যেখানটায় মানবিক দিকটা প্রাধান্য পেয়েছে।

পাবলো পিকাসোর কথাটাকে আমার নিজের মতো করে ব্যাখ্যা তো তাহলে করতেই পারি। হয়তো এটা দুঃসাহস হবে তবে সাহস না থাকলে চিন্তার শক্তি থাকেনা। এটাও মনে রাখতে হবে। আমার চিন্তাশক্তি বলছে পিকাসো এখানে অনুকরণ করা মানে নকল করাকে বুঝিয়েছেন। সেখানে ভালো শিল্পীদের স্বকীয়তা ও নিজের ভাবনা থাকেনা। অন্যের চিন্তাকে তারা ঘষে মেজে পরিবর্তন করে। এটা অনেকটা ফলিত গবেষণার মতো। পিকাসো চুরি করাকে চৌর্যবৃত্তি হিসেবে না দেখে অনেকটা চিন্তার আর্ট হিসেবে দেখেছেন। যেখানে মানুষ নিজে থেকে নতুন চিন্তা সৃষ্টি করতে পারে। কখনো প্রকৃতি, কখনো পৃথিবী ও কখনো সময়ের মতো শক্তি থেকে মানুষ চিন্তাকে চুরি করে মহান হয়ে উঠে। এটা অনেকটা মৌলিক গবেষণার মতো।

আমার খুব কাছের একজন বলেছেন- বড়দের মাঝে ছোট হয়ে থাকার চেয়ে ছোটদের মাঝে বড় হয়ে থাকাই শ্রেয়। এমন একটা ধারণা তার জার্মান মনোবিজ্ঞানী হারম্যান এব্বিংহসের অপটিক্যাল ইলুশন বা দৃষ্টির মায়াজাল থেকে এসেছে। মনোবিজ্ঞানের মন নিয়ে জটিল খেলা এটি। একটু যদি বিশ্লেষণ করি তবে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

একজন রাজার অনেক প্রজা থাকে। এখানে রাজা প্রজাদের নেতা। আবার একজন প্রজা তার পরিবারের নেতা। প্রজার কাছে রাজা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রজার পরিবারের কাছে প্রজা গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে নেতার সংজ্ঞাটা বদলে যায় আর চাওয়া পাওয়ার অপুর্ণতাটা থেকে যায়। আমি একজনের কাছে বড়, সে আরেকজনের কাছে বড় এমন ধারাটা চলতেই থাকে। যেমনটা বড় হয়ে উঠে মানুষের অপূর্ণতার অদৃশ্য হাত।

অপূর্ণতা সারাজীবন মানুষের জীবনকে পাগলা ঘোড়ার মতো তাড়িয়ে বেড়ায়। এই অপূর্ণতাটা থেকে যাওয়া খুব বেশি দরকার। পূর্ণতা মানুষকে খাঁটি মানুষে পরিবর্তন করতে যতটা অক্ষম অপূর্ণতা ঠিক ততটা সক্ষম। অপূর্ণতা একটা ফুলের মতো। যেটা টিকে থাকার লড়াই করে কিন্তু সময়ের কঠিন ধাক্কায় ভেঙে যায়।

প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ বলেছেন, “সব মানুষের জীবনেই অপূর্ণতা থাকবে। অতি পরিপূর্ণ যে মানুষ তাকে জিজ্ঞেস করলে সে ও অতি দুঃখের সঙ্গে তার অপূর্ণতার কথা বলবে। অপূর্ণতা থাকে না শুধু বড় বড় সাধক ও মহা পুরুষদের। ”

কথাটা খুব সত্যি। তবে বড় বড় সাধক ও মহাপুরুদেরও অপূর্ণতা বিন্দু বিন্দু ঘুমন্ত সত্তা নিয়ে থাকে। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সেটা আমরা দেখতে পেলেও তাদের ক্ষেত্রে পাইনা। সেটা তারা বুকে চাপা দিয়ে রাখে। কাউকে বলার মতো খুঁজে পায় না। হয়তো সারা পৃথিবী তাদের নিয়ে সরব কিন্তু তারা নিজেদের নিয়ে নীরব। আমরা যে যাই ভাবিনা কেন পৃথিবীতে একজন মানুষের সাধারণ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকাটা বেশি আনন্দের।

একটা শুন্য হাত অনেক জীবনকে পূর্ণতার স্বপ্ন দেখাতে পারে। কারণ শুন্যের মধ্যে যে অসীমতা রয়েছে তা আর অন্য কিছুতে নেই। সারা জীবন মানুষের বোঝাটা মাথায় নিয়ে যে মানুষের মেরুদন্ডটা নুয়ে পড়ে, ভেঙে যায়না। তার কাছে অপূর্ণতা স্বর্গের মতো। অপূর্ণতায় ত্যাগ থাকে। কষ্ট থাকে, কান্না থাকে, আবেগ থাকে, একটা মানুষ থাকে। কিছুদিন ধরে আমি অনেক কিছু নিয়ে ভেবেছি। সে ভাবনাগুলো পূর্ণতা না অপূর্ণতা তা কখনো বুঝে উঠতে পারিনি। যেমন-

“আমাকে ফেলে দিতে পারো নর্দমায়, আমি সেখান থেকে জীবনবোধের শক্তি ছিনিয়ে আনবো। ”

“তোমরা শুকুনির মতো আমাকে কামড়ে খেয়েছো, তোমরা মরলেও আমি বেঁচে আছি কারণ তোমরা আমাকে হজম করতে পারোনি। ”

“আমাকে যতটা অপবাদ দিয়েছো আমি তোমাদের ততটা ফুল দিবো, সে ফুলের কাঁটা তোমাদের অপরাধী মুখগুলো চিনিয়ে দিবে। ”

“তোমাদের মুখগুলো মানুষের মতো হলেও তোমরা মানুষ নও, হয় তোমরা বিশ্বাসঘাতক নয়তো নরখাদক। ”

“পারলে আমাকে আরও ছোট করো, আমি তোমাদের আরও বড় বানিয়ে পেন্ডুলামের মতো আকাশে ঝুলিয়ে রাখবো। ”

“আমাকে মূল্যহীন করে কাঁচের আয়না বানিয়ে রাখো, আমি আয়না হয়ে নষ্টদের মুখোশ খুলে দিবো । ”

“আমাকে ভেঙে চুরে চুরমার করে দাও আমি ধ্বংসস্তুপ থেকে আবার নিজেকে গড়ে তোমাদের ভাঙবো। ”

“পৃথিবীতে অন্যকে জানা যতটা কঠিন নিজেকে জানা তার থেকেও আরও কঠিন। ”

উপরের ভাবনাগুলো আমার দর্শন নাকি আমার অপূর্ণতা তা ঠিক জানিনা। তবে জীবনবোধের মূল্যে যে পূর্ণতা অপূর্ণতার খেলা চলছে সেটা শেষ হওয়া দরকার। কারণ সব যে এখন উল্টো পথে হাঁটছে। যার উত্তরের চেয়ে প্রশ্নটা অনেক কঠিন। তবুও অপূর্ণতায় মানুষ, পূর্ণতায় ভোগবাদিতা, কপটতা ও মৃত্যু। সেটা আমরা হয়তো জানি, বুঝি কিন্তু মানতে পারিনা।

প্রতিদিন মানুষের চেয়ে মানুষের আত্মার মৃত্যু বেশি দেখছি। তারপরও জীবনের উপর দিয়ে মানুষ হেঁটে যাক অপূর্ণতার গন্তব্যে। একটা গান সেই গন্তব্যকে দোলা দিয়ে যাক আকুল প্রাণের ব্যাকুলতায়। যেমনটি গানে আছে সেটাই রয়ে যাক অরণ্যের টানে এভাবেই-

“পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব মাগো, বলো কবে শীতল হবো

কত দূর আর কত দূর …বল মা?”

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

এ বিভাগের জনপ্রিয় খবর

সর্বশেষ
জনপ্রিয় খবর